উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
এম মহাসিন মিয়া, লেখক ||
প্রকৃতির এক অনুপম লীলাভূমি বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল। খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটির উঁচু-নিচু পাহাড়, সুউচ্চ ঝরনা এবং সবুজের সমারোহ প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটককে আকৃষ্ট করে। কিন্তু সম্ভাবনার এই বিশাল দুয়ার খোলা থাকলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা পাহাড়ের পর্যটন বিকাশে এক বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ দৃষ্টিনন্দন পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছানোর জন্য দূরবর্তী পাহাড়ি সড়কগুলো অত্যন্ত আঁকাবাঁকা, সংকীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে বর্ষাকালে পাহাড়ধস এবং ঢলের কারণে রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। উন্নত পরিবহন ব্যবস্থা ও সুপরিকল্পিত সড়ক যোগাযোগের অভাবে ভ্রমণপিপাসুরা চাইলেই সহজে পৌঁছাতে পারেন না। আধুনিক ও নিরাপদ যাতায়াত অবকাঠামো তৈরি না হওয়া পর্যন্ত পার্বত্য এলাকার পর্যটন শিল্প তার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবে না।পাহাড়ের পর্যটন খাতের বিকাশে সর্বপ্রধান এবং মারাত্মক বাধা হলো স্থানীয় আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অব্যাহত অপত তৎপরতা ও সহিংসতা। পাহাড়ে সক্রিয় আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস-মূল), ইউপিডিএফ (ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট-মূল), জেএসএস (সংস্কার) এবং ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এর সশস্ত্র ক্যাডাররা দীর্ঘদিন ধরে পুরো পার্বত্য এলাকাকে অস্থির করে রেখেছে। সম্প্রতি কেএনএফ (কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট) এর মতো নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান নিরাপত্তার সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। এলাকা দখল, আধিপত্য বিস্তার এবং রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রাখার নামে পাহাড়ে যে রক্তক্ষয়ী প্রতিযোগিতা চলে, তার প্রভাব সরাসরি পড়ে পর্যটন খাতের ওপর। সম্প্রতি সময়ে খাগড়াছড়ির পানছড়ি ও রাঙামাটির সাজেকে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন ইউপিডিএফ (প্রসীত) ও জেএসএস (সন্তু) এর মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাত চরম আকার ধারণ করেছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর এই ক্রমাগত সন্ত্রাস ও সহিংসতার ভয়ে সাধারণ পর্যটকেরা পাহাড়ে ভ্রমণ করতে মারাত্মকভাবে আতঙ্কবোধ করেন।পার্বত্য অঞ্চলে পর্যটন ব্যবসায়ী, হোটেল মালিক, পরিবহন চালক থেকে শুরু করে সাধারণ পর্যটক পর্যন্ত সবাই সশস্ত্র সংগঠনগুলোর বেপরোয়া চাঁদাবাজির শিকার। জেএসএস, ইউপিডিএফ এবং কেএনএফ এর মতো দলগুলো দূরবর্তী এলাকাগুলোতে বিকল্প প্রশাসন বা আড়ালে থেকে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে, যারা চাঁদা না দিলে ব্যবসা বন্ধের হুমকি দেয়। কেবল ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা দাবি করেই তারা ক্ষান্ত থাকে না, পর্যটক ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গুম ও অপহরণ করে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা পাহাড়ে এক দৈনন্দিন নৈরাজ্যে পরিণত হয়েছে।চাঁদাবাজির ভাগবাটোয়ারা ও আধিপত্যকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি ইউপিডিএফ (মূল) সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একের পর এক সাজেক পর্যটন সড়ক অবরোধ করে চলেছে, যা এই পর্যটন শিল্প এবং স্থানীয় হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এমনকি সম্প্রতি বান্দরবানের থানচিতে জেএসএস (সন্তু) কে চাঁদা না দেওয়ায় পর্যটকদের গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। পর্যটকবাহী যানবাহনে হামলা বা অপহরণের আশঙ্কায় প্রায়শই ভ্রমণের আনন্দ ভয়ে পর্যবসিত হয়। একটি পর্যটন অঞ্চলে যদি জীবনের নিরাপত্তাই না থাকে, তবে কোনো বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ বা বৈদেশিক বিনিয়োগ আশা করা একেবারেই অবাস্তব।আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার হুমকির কারণে পার্বত্য জেলাগুলোতে মাঝে মাঝেই পর্যটকদের চলাচলের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা বা বিশেষ বিধিনিষেধ আরোপ করতে বাধ্য হয় প্রশাসন। সম্প্রতি সময়েও সাজেক পর্যটন কেন্দ্রে এর ব্যতিক্রম হয়নি। নিরাপত্তার স্বার্থে বিদেশি পর্যটক এবং স্পর্শকাতর পাহাড়ি এলাকায় দেশি পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট অনুমতিপত্র গ্রহণের বিধান রয়েছে। যদিও এই পদক্ষেপগুলো পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থেই নেওয়া হয়, তবুও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও হঠাৎ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে ভ্রমণপিপাসুরা নিরউৎসাহিত হন। অনেক সময় অগ্রিম রিসোর্ট বুকিং এবং ভ্রমণের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকার পরও নিরাপত্তার কারণে হঠাৎ ভ্রমণ স্থগিত হওয়ায় পর্যটক ও ট্রাভেল এজেন্সিগুলো বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে ভ্রমণের এই নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তা পাহাড়ের পর্যটন খাতের বিকাশকে রুদ্ধ করছে।পাহাড়ের পর্যটন বিকাশের ক্ষেত্রে আবাসন ও আতিথেয়তা শিল্পের দুর্বলতাও কম দায়ী নয়। সাজেক বা বান্দরবানের কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চল ছাড়া অধিকাংশ প্রত্যন্ত কিন্তু দৃষ্টিনন্দন স্পটগুলোতে আন্তর্জাতিক মানের রিসোর্ট বা হোটেল গড়ে ওঠেনি। একই সাথে বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎ সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন এবং জরুরী চিকিৎসার পর্যাপ্ত সুবিধা না থাকায় পরিবার নিয়ে ভ্রমণকারীরা প্রায়ই ভোগান্তিতে পড়েন। উপরন্তু, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে পাহাড়ের অনেক পর্যটন কেন্দ্রে শক্তিশালী মোবাইল নেটওয়ার্ক বা দ্রুতগতির ইন্টারনেট সুবিধা নেই। তথ্যপ্রযুক্তির ঘাটতির কারণে পর্যটকরা অগ্রিম তথ্য অনুসন্ধান বা অনলাইনে রুম বুকিং করতে না পেরে বিভ্রান্ত হন। আধুনিক পর্যটন খাতের প্রসার ঘটাতে হলে শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মানের সেবা ও নিরবচ্ছিন্ন প্রযুক্তিগত সুবিধা।পাহাড়ের অন্যতম বড় শক্তি হলো এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও নিজস্ব পরিবেশগত ভারসাম্য। কিন্তু বর্তমানে পাহাড়ের যেসব এলাকায় পর্যটন সম্প্রসারিত হয়েছে, সেখানে অপরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন পাহাড়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে মারাত্মকভাবে নষ্ট করে তুলছে। অপরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থা সামগ্রিক পরিবেশের জন্য চরম হুমকির সৃষ্টি করছে। ট্যুরিস্টদের ফেলা প্লাস্টিক বর্জ্য, পলিথিন এবং বোতল পাহাড়ের প্রাকৃতিক ঝরনা ও নদীর পানি দূষিত করছে। অধিক সংখ্যক পর্যটকের অনিয়ন্ত্রিত সমাগম, যত্রতত্র রিসোর্ট নির্মাণ এবং পাহাড় কেটে পথ তৈরির ফলে পাহাড়ি বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক অধিবাস ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মুখে পড়েছে। পরিবেশবান্ধব বা ইকো-ট্যুরিজম নীতি অনুসরণ না করে যদি কেবল বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়, তবে পাহাড় তার আসল আকর্ষণ হারিয়ে ফেলবে এবং এতে দীর্ঘমেয়াদে পর্যটন শিল্প নিজেই বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়বে।পাহাড়ের পর্যটন খাত প্রসারিত হলেও এর সুফল পাহাড়ে বসবাসকারী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও সাধারণ বাঙালি অধিবাসীদের কাছে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে না। পর্যটন ব্যবসায় স্থানীয় তরুণ-তরুণীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মতো প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। দক্ষ ও প্রশিক্ষিত গাইড না থাকায় পর্যটকরা পাহাড়ি ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঠিক পরিচয় জানতে ব্যর্থ হন। স্থানীয় হস্তশিল্প, ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোকে পর্যটন বাণিজ্যের মূলধারায় সংযুক্ত করার সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগ এখনো সীমিত। স্থানীয়রা যদি পর্যটন খাত থেকে প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক সুবিধা না পান, তবে এই শিল্পের প্রতি তাদের আগ্রহ ও আতিথেয়তার মানসিকতা গড়ে উঠবে না। ফলে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।পার্বত্য অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সমস্ত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সরকার এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনী পাহাড়ের শান্তি ও উন্নয়ন রক্ষায় নিরলসভাবে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে আসছে। সীমান্ত সড়ক নির্মাণ, দুর্গম এলাকায় সড়ক যোগাযোগ উন্নয়ন এবং সেনাবাহিনী পরিচালিত পর্যটন স্পট ও পার্কগুলো পাহাড়ে পর্যটনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। নিরাপত্তা বাহিনী কেবল অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ও সশস্ত্র ক্যাডারদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযানই চালাচ্ছে না, বরং পর্যটকদের জানমালের রক্ষক হিসেবে সার্বক্ষণিক নজরদারি বজায় রাখছে। পাহাড়ের পর্যটনকে পূর্ণ সম্ভাবনায় রূপ দিতে হলে ইউপিডিএফ, জেএসএস ও কেএনএফ এর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র সমর্পণ ও অবৈধ চাঁদাবাজি-সন্ত্রাস কঠোর হাতে নির্মূল করতে হবে। সরকার, নিরাপত্তা বাহিনী ও স্থানীয় অধিবাসীদের সমন্বিত প্রয়াসে পাহাড়ে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলেই পাহাড় হবে দেশের শীর্ষ পর্যটন হাব।লেখক: এম মহাসিন মিয়া কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক লেখক।ইমেইল: mmohasinmiah013@gmail.com