উপজাতি ও আদিবাসী বিতর্ক; উপজাতিরা কি আদিবাসী?
পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত উপজাতিরা কি নিজেদের আদিবাসী বা ভূমিপুত্র হিসেবে দাবি করতে পারে? পার্বত্য চট্টগ্রামে কে আগে আসলো আর কে পরে আসলো তা দিয়ে আদিবাসী নির্ধারণ হয় না। উপজাতিরা পার্বত্য চট্টগ্রামে আগে থেকে বাস করে আর বাঙালিরা ১৯৭৯ সাল থেকে। এমনটা সত্য নয়। আর এই যুক্তি নিয়ে আদিবাসী নির্ধারিত হয় না। এর আগেও এ অঞ্চলে বাঙালির বসবাস ছিল। তা নিম্নে আলোচনা করছি। মূলত আদিমতম জনগোষ্ঠী বা ভূমিপুত্র হচ্ছে আদিবাসী। আজকের কথিত আদিবাসী দাবিদাররা একসময় নিজেদের উপজাতি হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করত। “কার্পাস মহল থেকে শান্তিচুক্তি।” পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রীয় নীতির ইতিহাস পার্বত্য চট্টগ্রামের উপর রচিত একটি কথিত পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ। ১৭১৫ সালে মুঘল প্রশাসকদের সাথে পার্বত্য চাকমা সার্কেল চিফের সম্পাদিত বাণিজ্য চুক্তি থেকে যে কার্পাস মহলের জন্ম, ১৯৯৭ সালের পার্বত্য শান্তিচুক্তি সেই অঞ্চলটির ইতিহাসের সর্বশেষতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কার্পাস মহল থেকে শান্তিচুক্তি বইটিতে এই বিস্তৃত পরিসর জুড়ে ঘটে যাওয়া ইতিহাসকে আলোচনা করা হয়েছে রাষ্ট্রীয় নীতি সেখানে কী ভূমিকা রেখেছে, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে। মুঘল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি পর্বে এই অঞ্চলটির ঘটনাবলির বিকাশের একটা পর্যালোচনা পাঠক এখানে পাবেন। এই নিয়ে নানা তর্ক-বিতর্ক থাকতে পারে বইটিতে কিন্তু তৎকালীন ঘটনায় এ অঞ্চলের জাতিসত্তাকে উপজাতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যা ইতিহাসের জন্য এক দলিল হতে পারে। আরো তথ্য হলো, ১৯৯৭ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সময় (পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের পক্ষ থেকে জেএসএস সন্তু) নিজেদের উপজাতি হিসেবে স্বাক্ষর করেছে, চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে এবং চুক্তির খ খণ্ডের জেলা পরিষদ আইনের বিভিন্ন ধারায় উপজাতি শব্দটি প্রতিস্থাপিত হয়েছে। চুক্তিতে ৫২ বার উপজাতি শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায়। সেখানে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বম, খুমি, লুসাই, চাক, মুরং প্রভৃতি নামে পরিচিত ছিল। যা ছিল সবচেয়ে উত্তম পরিচয় এবং সমষ্টিগতভাবে উপজাতি। ভাষা, সংস্কৃতি, বসবাসের ইতিহাস বিবেচনায় এবং নৃতাত্ত্বিক বিচারে কথিত আদিবাসী দাবিদাররা উপজাতি। আজকের উপজাতি নেতৃত্ব বা দলরা ব্রিটিশদের প্রথাগত আইন মানে কিন্তু তাদের আইনের ‘উপজাতি’ মানে না! পার্বত্য চট্টগ্রাম রেজুলেশন (প্রথাগত আইন) ৫২ ধারায় বাংলাদেশে উপজাতিরা অভিবাসী হিসেবে স্বীকৃত! ব্রিটিশরা কখনও তাদের শরণার্থীর বাইরে স্বীকৃতি দেয়নি। বাংলাদেশ সংবিধান উপজাতি ২৩(ক) ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী/উপজাতি হিসেবে অভিহিত করেছে। ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণসহ জীবনমান পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। আদিবাসী দাবি যে একটি ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত তা স্পষ্ট হবে এখনই। উপজাতি কোটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা করে এবং চাকরি করে। কিন্তু দাবি করে আদিবাসী! বাংলাদেশের মতো আরাম-আয়েশে পৃথিবীর আর কোথাও উপজাতিরা এত এত সুবিধা ভোগ করে না। বাংলাদেশ ভূখণ্ড থেকে কি কেউ তাদেরকে দৌড়াচ্ছে? উপজাতি অধিকারে কি কেউ হস্তক্ষেপ করছে? কেন আজ তারা নব্য আদিবাসী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত? নিশ্চয়ই এখানে তাদের এমন কোনো বিশেষ স্বার্থ জড়িয়ে আছে। পাহাড়ের সাধারণ উপজাতিরা ‘আদিবাসী শব্দ’ নিয়ে বিশেষ আগ্রহ নেই। তারা স্ব স্ব পরিচয়ের পাশাপাশি পাহাড়ি বা উপজাতি হিসেবে সন্তুষ্ট।যে-সকল বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসীগোষ্ঠী ও তাদের সমর্থকরা আদিবাসী দাবি করছে, তাদের সহযোগিতা করছে বাম দল, কথিত সুশীল, বুদ্ধিজীবী, এনজিও, মিডিয়া। হতে পারে এমনও স্বার্থ আছে, যেখানে তারা লাভবান।বামরা আর উগ্র উপজাতিরা কোনো ধর্ম, আইন, যুক্তি মানে না। এদের মতের বিরুদ্ধে গেলে গালমন্দ করে। খুবই উগ্র টাইপের কথাবার্তা বলে। তাদের কাছে প্রশ্ন থাকলো- ভাসানচরে রোহিঙ্গারা এখন প্রথম বসবাসকারী। কারণ এখানে রোহিঙ্গাদের আগে মানববসতি ছিল না। যেহেতু ওখানে বাঙালি নেই এই বিচারে কিন্তু রোহিঙ্গারা আদিবাসী হওয়ার দাবি রাখে। এখন কী আপনি রোহিঙ্গাদের এ দেশের আদিবাসী হিসেবে অর্থাৎ ভূমিপুত্র হিসেবে স্বীকৃতি দিবেন? তাদের জন্য আন্দোলন বা গলা ফাটাবেন? যদি রোহিঙ্গাদের আদিবাসী হিসেবে মেনে নিতে পারেন, তাহলে উপজাতিদের এ দেশে আদিবাসী হিসেবে মেনে নিতে আপনার মত আমারও আপত্তি থাকার কথা নয় কিন্তু যদি রোহিঙ্গাদের আদিবাসী বলতে আপত্তি থাকে তাহলে উপজাতিদের এ দেশে আদিবাসী বলতে আমার যথার্থ আপত্তি আছে।সরকার এই বর্বর, অকৃতজ্ঞ ও দেশদ্রোহী উপজাতিদের একটি অংশকে থামানোর জন্য ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সম্পাদিত করে। কোনো বাংলাদেশি সুস্থ জ্ঞানের মানুষ যদি পার্বত্য চুক্তি পড়ে তাহলে সে জীবনে আর উপজাতিদের অধিকার প্রশ্নে কথা বলবে না। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল বা প্রদেশের মতো হয়ে গেছে। চুক্তির মাধ্যমে উপজাতিরা অস্ত্র ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার কথা ছিল কিন্তু তারা এখনো অবৈধ অস্ত্র নিয়ে পাহাড়ে চাঁদাবাজি, অপহরণ আর বাঙালি হত্যা করে যাচ্ছে। পার্বত্য এলাকায় প্রতিনিয়ত বাঙালি ও সরকারি বাহিনী উপজাতি জেএসএস, ইউপিডিএফ ও কেএনএফ এর মতো সংগঠনের হাতে হামলা, মামলা, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও হত্যার শিকার হয়ে আসছে। সেখানে এই বর্বর, দেশদ্রোহী, বিশ্বাসঘাতক উপজাতিদের আদিবাসী হিসেবে গ্রহণ করা রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে।আপনি যদি বলেন তাদের অধিকারের কথা তাহলে, এই তথ্যগুলো আপনার জানার উচিত। উপজাতিদের যে-সকল ন্যায় অধিকার আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সম্পাদিত করার মাধ্যমে প্রদান করা হয়েছে, কোটা প্রথা, নানান সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বা উপজাতি জাতিসত্তা হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়েছে। আজকে যে উপজাতিরা পার্বত্য চট্টগ্রামে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা, চাকরির মাধ্যমে অগ্রসর জাতিতে পরিণত হয়েছে তা কিন্তু রাষ্ট্র ও বাঙালি জনগণ উপজাতি জনগোষ্ঠীর প্রতি মানবিকতা, উদারতা ও আন্তরিকতার ফল ঘটেছে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে যেভাবে উপজাতিরা শিক্ষা-দীক্ষায় ও অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে সে হিসেবে সমতলের ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, রাজশাহী, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনগণ অনেক অনেক পিছিয়ে। এক্ষেত্রে কেবল সমতলের উপজাতিদের অধিকার সম্পর্কে আমাদের সচেতন হতে হবে এবং তাদের অধিকার আদায়ে তাদের কথা শুনতে হবে।তথ্যের উৎস: বাংলাদেশ সংবিধান, জাতিসংঘের ILO Convention, বিভিন্ন লেখকদের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক বই, পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ ও উইকিপিডিয়া।