পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক পরামর্শক কমিটি: প্রয়োজনের চেয়ে নতুন জটিলতার আশঙ্কা।
শতকোটি টাকা ব্যয় করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক পরামর্শক কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তটি আদৌ কতটা প্রয়োজনীয়, এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কারণ, পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে নতুন কোনো কাঠামো তৈরি করার আগে এর সম্ভাব্য প্রভাব, প্রশাসনিক কার্যক্রম, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। অন্যথায় ভবিষ্যতে এই সিদ্ধান্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের জন্য নতুন ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে।বাংলাদেশ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের অধিকার, মর্যাদা ও অংশগ্রহণের প্রশ্নটি সংবিধানের মৌলিক চেতনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে কোনো পরামর্শ, নীতিনির্ধারণ বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সেখানে বসবাসরত কোনো জনগোষ্ঠীকেই উপেক্ষা করার সুযোগ থাকা উচিত নয়।এই জায়গাতেই বর্তমান পরামর্শক কাঠামো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন সামনে আসে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব কোথায়?। এ অঞ্চলের প্রায় ৫৪ শতাংশ মানুষ বাঙালি জনগোষ্ঠীর। অথচ এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত না করে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো পরামর্শক কাঠামো তৈরি করা হলে তা স্বাভাবিকভাবেই প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করবে। এটি কেবল প্রশাসনিক ত্রুটি নয়, সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও ন্যায্য প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নও বটে।তবে বিষয়টিকে কোনো জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অন্য জাতিগোষ্ঠীকে দাঁড় করিয়ে দেখার সুযোগ নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে সকল নাগরিকই বাংলাদেশের নাগরিক এবং রাষ্ট্রের সমান অধিকার ও নিরাপত্তার দাবিদার। তাই কোনো পরামর্শক কমিটি বা নীতিনির্ধারণী কাঠামোকে এমন হতে হবে, যেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সকল জাতিগোষ্ঠীর ন্যায্য ও কার্যকর প্রতিনিধিত্ব থাকবে। কোনো একটি পক্ষের একচেটিয়া মতামতের ভিত্তিতে এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যেমন যুক্তিসংগত নয়, তেমনি সংখ্যার অজুহাতে কোনো ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার ও মতামতকেও উপেক্ষা করা উচিত নয়।বিশেষ করে, এই ধরনের পরামর্শক কাঠামো যদি পার্বত্য চট্টগ্রামের মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করে, তাহলে প্রশাসনের স্বাভাবিক ও স্বাধীন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ভিন্ন। এখানকার ভৌগোলিক অবস্থান, সামাজিক বৈচিত্র্য, দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সীমান্ত বাস্তবতা এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সহাবস্থানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন।দুঃখজনক হলেও সত্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে সরকারের বিভিন্ন সময়ে নেওয়া কিছু সিদ্ধান্তে তাড়াহুড়োর প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। অথচ এই অঞ্চলের বাস্তব পরিস্থিতি, নিরাপত্তা ঝুঁকি, স্থানীয় জনগণের অভিজ্ঞতা এবং মাঠপর্যায়ের প্রশাসনের মতামত বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পার্বত্য চট্টগ্রামের সংবেদনশীলতা, ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বছরের পর বছর দায়িত্ব পালন করে আসছে। সেনাবাহিনীর এই দীর্ঘ সময়ের মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা, নিরাপত্তা-বাস্তবতা এবং অর্জিত জ্ঞানকে উপেক্ষা করে পার্বত্য চট্টগ্রামসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া বাস্তবসম্মত হতে পারে না।সুতরাং পার্বত্য চট্টগ্রামসংক্রান্ত যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত, প্রশাসনিক কিংবা নিরাপত্তা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক দৃষ্টিভঙ্গি নয়, মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তা বাস্তবতাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বাহিনীর অভিজ্ঞতা ও পেশাগত পরামর্শকে যথাযথভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ, একটি সিদ্ধান্ত কাগজে-কলমে যতটা যৌক্তিক মনে হতে পারে, মাঠের বাস্তবতায় তার প্রভাব সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।আমার মতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ভবিষ্যতে যেকোনো পরামর্শক কমিটি, নীতিনির্ধারণী ফোরাম বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো গঠনের ক্ষেত্রে অন্তত চারটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি। প্রথমত, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সকল জাতিগোষ্ঠীর ন্যায্য ও কার্যকর প্রতিনিধিত্ব। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় প্রশাসনের বাস্তব অভিজ্ঞতার যথাযথ মূল্যায়ন।তৃতীয়ত, নিরাপত্তা বাহিনীর মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও পেশাগত মতামতের পূর্ণ বিবেচনা। এবং চতুর্থত, বাংলাদেশের সংবিধান, আইন, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার প্রতি সুস্পষ্ট অঙ্গীকার।পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানের পথ কোনো একটি জাতিগোষ্ঠীকে প্রাধান্য দেওয়া কিংবা অন্য কোনো জনগোষ্ঠীকে বাদ দেওয়ার মধ্যে নেই। সমাধানের পথ হলো, সকল নাগরিকের সমঅধিকার, ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব, আইনের শাসন, প্রশাসনিক ভারসাম্য, নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ।স্বাধীন বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা অক্ষুণ্ণ রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি, নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও সম্প্রীতি নিশ্চিত করতে হলে আবেগ বা তাড়াহুড়ো নয়, প্রয়োজন বাস্তবতা, অভিজ্ঞতা, সংবিধানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয়। পাহাড়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে পাহাড়ের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই, কোনো পক্ষকে বাদ দিয়ে নয়।_এম মহাসিন মিয়াসাংবাদিক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক।
৩ ঘন্টা আগে