শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬
০৬ জুন, ২০২৬ ঢাকা
চ্যানেল সিএইচটি

বান্দরবানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভয়ংকর হয়ে উঠছে ‘ধর্মান্তর ব্যবসা' ব্যাপক হারে চলছে খ্রিষ্টাইনাজেশন।

দেশের উপজাতি-অধ্যুষিত ও দারিদ্র্য-পীড়িত প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে খ্রিষ্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত করার প্রবণতা ‘ভয়াবহ আকারে’ বেড়েই চলেছে। পশ্চিমা বিশ্বের অর্থায়নে পরিচালিত এনজিও ও খ্রিষ্টান মিশনারি সংস্থাগুলো সেবা ও উন্নত জীবনের প্রলোভনে উপজাতীয় ধর্মে বিশ্বাসীদেরকে খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষিত করে চলেছে। খ্রিষ্ট ধর্ম প্রচারে কোনো ধরনের বাধা- বিপত্তিকে তোয়াক্কা করছে না মিশনারিরা। বরং মুসলিম দাঈ কিংবা এ তৎপরতা সম্পর্কে সতর্ককারী স্থানীয় উপজাতি মুসলিমদের নানা ধরনের চাপে রাখছে তারা।রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি তিনটি জেলা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তৃতি। পার্বত্য চট্টগ্রামে সবচেয়ে আশঙ্কাজনকভাবে খ্রিষ্টান মিশনারিরা কাজ করছে। উপজাতিদের বড় একটি অংশ এখন খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষিত হয়ে গেছে বলে জানাচ্ছেন অঞ্চলটিতে দাওয়াতি মেহনতের সঙ্গে জড়িত আলেম দাঈগণ। তাঁদের মধ্যে একজনের সঙ্গে কথা হয়েছিল। নিরাপত্তা জনিত কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় প্রতিটি এলাকাই আমার ঘোরা হয়েছে। দাওয়াতি কাজে এই এলাকায় এত বার যাওয়া হয়েছে যে, অনেক এলাকা নিজের এলাকার মতোই আমার কাছে পরিচিত। দুঃখজনক হলো, আজ থেকে ২০-২২ বছর আগে এখানে ১ পার্সেন্টরও কম খ্রিষ্টান থাকলেও বর্তমানে খ্রিষ্টান মিশনারিদের তৎপরতার দরুণ এখানকার বড় একটি অংশ খ্রিষ্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে গেছে।তিনি বলেন, ‘ছোট-বড় প্রায় ১৪টি উপজাতীয় গোষ্ঠীর বসবাস এই অঞ্চলে। তাদের মধ্যে মধ্যে ছোট ছোট যে গোষ্ঠীগুলো, তাদের প্রায় সকলেই খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে নিয়েছে। গহীন পাহাড়ের ভেতর তাদের বসবাস, কিন্তু আপনি যদি সেখানে যান আর তাদের জীবনমান দেখেন, তবে মনেই হবে না, আপনি বাংলাদেশে আছেন, মনে হবে ওয়েস্টার্ন কোনো কান্ট্রিতে এসেছেন।‘খ্রিষ্টান মিশনারিরা তাদের শিক্ষাদীক্ষা থেকে শুরু করে রাস্তা-ঘাট সব কিছু করে দিচ্ছে। বিনিময়ে তাদেরকে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত করছে। কনভার্টেড এসব খ্রিষ্টানদের সঙ্গে কথা বললে আপনি চমকে যাবেন। এদের ভাব ও আচারে মনেই হবে না এরা বাংলাদেশ নামক কোনো রাষ্ট্রকে স্বীকার করে। তাদের এমনও এলাকা আছে যেখানে খ্রিষ্ট মিশনারিদের দ্বারা প্রুফ করা। সেখানে যেতে হলে বিশেষ বাহিনীর পারমিশন লাগে। আর নির্দিষ্ট লোক ব্যতীত সেখানে ঢোকার পারমিশনও পাওয়া যায় না। পাশরাঙ্গামাটির বড়কল উপজেলায় আছে এমন একটি এলাকা।বান্দরবানের লামায় মিরিঞ্জা নামক একটা এলাকা আছে, সেখানের উঁচু এক টিলায় মং সম্প্রদায়ের বসবাস। যাদের অধিকাংশই খ্রিষ্টান হয়ে গেছে। খ্রিষ্টান মিশনারিদের কল্যাণে উন্নত হয়েছে তাদের জীবনমান। মং সম্পদায়ের নেতাদেরকে ‘কারবারি’ বলা হয়। সেখানে একবার সফরে গেলে এক কারবারির সঙ্গে কথা হয়েছিল আমার। সে জানাল, ধর্ম যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার, এমনটা ধারণায়ও ছিল না তাদের। একসময় তারা মনে করত জন্মসূত্রে মুসলিম না হলে কেউ মুসলিম হতে পারত না। এই খ্রিষ্ট মিশনারিরা আসার আগে তাদের কেউ কেউ মুসলিম হতে চাইলে এমন কেউ ছিল না, যে তাকে মুসলিম বানাবে। স্থানীয় বাঙালি মুসলিম যারা ছিল, তারা তাদেরকে মুসলিম সমাজে দাখিল করতে অস্বীকৃতি জানাত। গত ২০ অক্টোবর,২০২৫ তারিখ দুপুরে দক্ষিণ কোরিয়ার ১১ জন ও যুক্তরাষ্ট্রের ১ জন নাগরিক একটি মাইক্রোবাসে বান্দরবানে প্রবেশ করেন। পর্যটক হিসেবে অনুমতি নিয়ে তারা হোটেল ডি’মোরে অবস্থান নেন। বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে ওই হোটেলের হলরুমে “লাইফ ওয়ার্ড মিশন”-এর ব্যানারে ধর্মীয় সভা শুরু করেন তারা। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, বিদেশি নাগরিকরা পার্বত্য জেলায় কেবল ভ্রমণ বা পর্যটন উদ্দেশ্যে প্রবেশের অনুমতি পান এবং তাদের কোনো ধর্মীয়, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু এই বিদেশিরা স্পষ্টভাবে সেই শর্ত ভঙ্গ করেছেন।ধর্মীয় সভায় অংশ নেওয়া বিদেশিদের মধ্যে ছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার ইয়াংসান পার্ক, সুমি লি, বংসুন পার্ক, ইওন কিয়ং ও, ইওন কিয়ং বাইক, চ্যাংহো চো, হুন ইল চোই, সন উং কিম, চ্যাং সান চোই, হিউং ইল কিম, চোল ই হং এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইয়ানা কিম। প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ও পুলিশ স্কটের মাধ্যমে মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে তারা চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে বান্দরবান ত্যাগ করেন।খ্রিষ্টান মিশনারিরা এসে এখন তাদের মনোভাব বদলে দিয়েছে। দলে দলে তাই তারা খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে পাচ্ছে উন্নত জীবনমানের ব্যবস্থা।’পাহাড়ের দূর্গম এলাকা গুলোতে নতুন করে কোনো মসজিদ-মাদরাসা স্থাপন করতে হলে ব্যাপক বেগ পেতে হয়। খ্রিষ্টান মিশনারি ও তাদের নিরাপত্তা বিধায়ক উপজাতীয় সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো প্রতিনিয় মত বাঁধা দিচ্ছে। এছাড়াও এনজিও গুলো আনেকগুকো ন্যারেটিভ নিয়ে কাজ করে। পার্বত্য চট্টগ্রামে এনজিও গুলোর কার্যক্রমের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা। রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ বা ‘উপজাতি’ হিসেবে পরিচিত জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ (Indigenous) হিসেবে ব্র্যান্ডিং করার একটি জোরালো ও দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প চলমান। এই ন্যারেটিভ পরিবর্তনের মাধ্যমে তারা সমস্যাটিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জাতিগত বৈচিত্র্যের বিষয় না রেখে, এটিকে জাতিসংঘের ‘আদিবাসী অধিকার চার্টার’ (UNDRIP)-এর অধীনে একটি আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত করতে চায়। এর ফলে ভূমির ওপর রাষ্ট্রের অধিকার এবং সংবিধানের সার্বভৌমত্ব সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিতে এনজিওর পরোক্ষ ভূমিকাও কম নয়। একটি বড় উদাহরণ হলো ‘ডি-মিলিটারাইজেশন’ বা অসামরিকীকরণের একপেশে প্রচারণা। পার্বত্য চট্টগ্রামে এনজিও এবং তাদের সৃষ্ট সিভিল সোসাইটির একটি প্রধান দাবি হলো ‘অসামরিকীকরণ’ বা সেনাবাহিনীর ক্যাম্প প্রত্যাহার। পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি ত্রি-দেশীয় (বাংলাদেশ-ভারত - মিয়ানমার) সীমান্তবর্তী স্পর্শকাতর এলাকা এবং এটি বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের চারণভূমি। যখন এনজিওগুলো শুধু রাষ্ট্রকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেয়, কিন্তু সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে (যেমন ইউপিডিএফ, জেএসএস, কেএনএফ) নিরস্ত্র করার বিষয়ে নীরব থাকে, তখন তারা পরোক্ষভাবে একটি ‘নিরাপত্তা শূন্যতা’ তৈরি করতে চায়। এই শূন্যতা রাষ্ট্রকে দুর্বল করে এবং সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ করে দেয়, যা অস্থিতিশীলতাকে আরও বৃদ্ধি করে। এর মাধ্যমে উপজাতি সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে তারা এই অঞ্চলকে সায়ত্তশাসনের দাবি তুলবে এবং খ্রিস্টান অঞ্চলে রূপান্তর করবে।এছাড়াও, দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় এনজিওর আড়ালে গোপনে মিশনারি কার্যক্রম চলছে, যেগুলোতে অর্থায়ন করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন খ্রিস্টান দেশ ও প্রতিষ্ঠান। এসব কার্যক্রমের লক্ষ্য পার্বত্য চট্টগ্রামে খ্রিস্টান প্রভাব বিস্তার এবং স্থানীয় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ে পরিবর্তন আনা। নতুন করে ধর্মান্তর ঠেকাতে উত্তরাঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জনগণ গঠন করেছে ‘আদিবাসী সনাতন ধর্ম রক্ষা পরিষদ’। জাতীয় আদিবাসী পরিষদ ও আদিবাসী উন্নয়ন সংস্থার হিসাবে, দেশের প্রায় ৩০ লাখ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অর্ধেকের বাস উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায়। জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রবীন্দ্রনাথ সরেন ও আদিবাসী উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ভাগবত টুডু জানান, উত্তরাঞ্চলের ১৫ লাখ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে ছয় লাখেরও বেশি এরই মধ্যে ধর্মান্তরিত হয়েছে। এ অঞ্চলের আড়াই লাখ সাঁওতালের মধ্যে দুই লাখই তাদের নিজ ধর্ম ‘সর্বপ্রাণবাদ’ ছেড়ে খ্রিস্টান হয়েছে। এদের মধ্যে অতিদরিদ্র সাঁওতালদের সংখ্যাই বেশি।এই বিষয়ে ফাদার কোড়াইয়া প্রতীক ইজাজ ‘যে মানুষ নিজের ধর্ম সম্পর্কে জানে না, যে মানুষ ২০০ টাকার জন্য নিজের ধর্ম বিক্রি করে দেয়, তার অর্থ হলো নিজ ধর্মের প্রতি তার বিশ্বাস নেই। গভীরতা নেই। প্রলোভনে পড়ে যারা নিজ ধর্ম ছেড়ে অন্য ধর্মে ধর্মান্তরিত হন, ধর্ম তাদের কাছে ক্ষণস্থায়ী। ধর্মের প্রতি বিশ্বাস রাখতে হলে যেকোনো চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। আর যদি কেউ দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে, নানা প্রলোভন দেখিয়ে, অন্যকে নিজ ধর্মে ধর্মান্তরিত করেন, তা হলে তা হবে অমানবিক। এমনটি কখনোই উচিত নয়। কোনো ধর্মই তা বলে না।’ প্রশাসনিক সূত্র বলছে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় কিছু এনজিওর আড়ালে গোপনে মিশনারি কার্যক্রম চলছে, যেগুলোতে অর্থায়ন করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন খ্রিস্টান দেশ ও প্রতিষ্ঠান। এসব কার্যক্রমের লক্ষ্য পার্বত্য চট্টগ্রামে খ্রিস্টান প্রভাব বিস্তার এবং স্থানীয় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ে পরিবর্তন আনা।

বান্দরবানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভয়ংকর হয়ে উঠছে ‘ধর্মান্তর ব্যবসা' ব্যাপক হারে চলছে খ্রিষ্টাইনাজেশন।