রক্তের ঋণ এখনো শোধ হয়নি: নাইক্ষ্যংছড়ি বাঙালি গণহত্যার বিচার চাই, ন্যায়বিচারের অটল দাবি।
১৬ এপ্রিল, এই দিনটি বাংলাদেশ তথা পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে এক গভীর বেদনা, ক্ষোভ ও অনন্ত প্রশ্নের প্রতীক। ১৯৯০ সালের এই দিনে বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়িতে নিভৃত পাহাড়ি জনপদে সংঘটিত হয়েছিল এক নৃশংস হত্যাযজ্ঞ, যা 'নাইক্ষ্যংছড়ি গণহত্যা' নামে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, কিন্তু এই ঘটনার ক্ষত আজও শুকায়নি, বরং বিচারহীনতার কারণে তা আরও গভীর হয়েছে।১৯৯০ সালের সেই দিনটি শুরু হয়েছিল স্বাভাবিকভাবেই। পাহাড়ি গ্রামগুলোতে মানুষ তাদের দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত ছিল। কেউ মাঠে, কেউ ঘরে, কেউবা বাজারে। কিন্তু হঠাৎ করেই নেমে আসে বিভীষিকার কালো ছায়া। অভিযোগ অনুযায়ী, পার্বত্য অঞ্চলের আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এর সশস্ত্র সদস্যরা পরিকল্পিতভাবে নিরীহ বাঙালি গ্রামবাসীদের ওপর হামলা চালায়। এই হামলা ছিল আকস্মিক, সংগঠিত এবং ভয়াবহ।নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় অন্তত ১৯ জন নিরীহ বাঙালিকে। তারা কেউই কোনো সংঘর্ষে জড়িত ছিল না, তারা ছিল সাধারণ মানুষ তথা কৃষক, দিনমজুর, পরিবারপ্রধান। তাদের একমাত্র 'অপরাধ' ছিল তারা বাঙালি এবং তারা ওই এলাকায় বসবাস করছিল। আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন জেএসএস'র এই নির্মমতা মানবতার সকল সীমা অতিক্রম করে।এই ঘটনার সবচেয়ে ভয়াবহ ও লজ্জাজনক দিকগুলোর একটি হলো বাঙালি নারীদের ওপর চালানো পাশবিক নির্যাতন। অভিযোগ রয়েছে, বহু নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। নারীর প্রতি এই ধরনের সহিংসতা শুধু একটি ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, এটি একটি সমাজের সম্মানের ওপর আঘাত। ধর্ষণকে যখন অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন তা কেবল শারীরিক নয়, মানসিক ও সামাজিক ধ্বংস ডেকে আনে। এই ধরনের অপরাধ আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী মানবতার বিরুদ্ধে এক বর্বরোচিত অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।শুধু হত্যা ও নির্যাতনেই থেমে থাকেনি এই বর্বরতা। এছাড়াও এই হামলায় অন্তত ৮৩ জনের বেশি বাঙালিকে গুরুতরভাবে আহত হয়। অনেকেই স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করে, অনেকেই আজও সেই দিনের শারীরিক ও মানসিক ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন। তারা জীবন্ত সাক্ষী, সেই ভয়াল দিনের নির্মমতার।তবে এই ঘটনার সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক হলো অপহরণ ও গুম। শতাধিক বাঙালিকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়, যাদের অধিকাংশের কোনো খোঁজ আজও পাওয়া যায়নি। তাদের পরিবারগুলো আজও অপেক্ষায় আছে, কোনো একদিন হয়তো তারা ফিরে আসবে, অথবা অন্তত তাদের লাশ পাওয়া যাবে। এই অনিশ্চয়তা, এই অপেক্ষা, এটাই সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা।একজন মা প্রতিদিন তার সন্তানের পথ চেয়ে বসে থাকেন, একজন স্ত্রী প্রতিটি দরজার শব্দে চমকে ওঠেন, হয়তো তার স্বামী ফিরে এসেছে। কিন্তু দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়, কেউ ফিরে আসে না। এই অজানা শূন্যতা, এই অন্তহীন অপেক্ষা, এটি এক ধরনের মানসিক নির্যাতন, যা মৃত্যুর চেয়েও কঠিন ও ভয়ংকর।কিন্তু এতসব ভয়াবহতার পরও সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থেকে যায়, এসব বর্বরোচিত অপরাধের বিচার কোথায়? কেন এখনো এই গণহত্যার বিচার হয়নি? কেন অপরাধীরা শাস্তির মুখোমুখি হয়নি? তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও যদি একটি গণহত্যার বিচার না হয়, তাহলে এটি শুধু একটি ঘটনার ব্যর্থতা নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট তৈরি করে।বিচারহীনতা একটি সমাজের জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক। এটি অপরাধীদের সাহস জোগায় এবং ভবিষ্যতে আরও অপরাধ সংঘটনের পথ তৈরি করে। যখন মানুষ দেখে যে এত বড় অপরাধ করেও কেউ পার পেয়ে যায়, তখন তাদের মধ্যে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা কমে যায়। একটি রাষ্ট্র তখনই দুর্বল হয়ে পড়ে, যখন সেখানে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না।নাইক্ষ্যংছড়ি গণহত্যার বিচার না হওয়া মানে শুধু অতীতের একটি ঘটনার অবহেলা নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি অশুভ বার্তা। নতুন প্রজন্ম যদি দেখে যে এমন ভয়াবহ অপরাধেরও বিচার হয় না, তাহলে তাদের মধ্যে ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা কমে যাবে। তারা বিশ্বাস হারাবে, আইন সবার জন্য সমান নয়।এই ঘটনার বিচার শুধু ভুক্তভোগীদের অধিকার নয়, এটি পুরো জাতির দাবি। কারণ একটি অন্যায় যখন বিচারহীন থাকে, তখন তা সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রভাব ফেলে। তাই এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।একইসাথে, এই ঘটনার ইতিহাস সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। অনেক সময় দেখা যায়, সময়ের সাথে সাথে এমন ঘটনাগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। কিন্তু ইতিহাস ভুলে গেলে সেই ভুল আবারও ফিরে আসে। তাই প্রয়োজন এই ঘটনার দলিলপত্র সংরক্ষণ, গবেষণা, এবং নতুন প্রজন্মকে এই সত্য জানানো।গণহত্যার শিকারদের স্মরণে একটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রয়োজন। একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা যেতে পারে, যেখানে মানুষ এসে শ্রদ্ধা জানাতে পারবে, ইতিহাস জানতে পারবে। এটি শুধু স্মরণ করা নয়, এটি একটি শিক্ষা, একটি বার্তা যে, অন্যায় কখনোই মেনে নেওয়া হবে না।পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি বহুজাতিক, বহুসাংস্কৃতিক অঞ্চল। এখানে বহু জাতিগোষ্ঠীর মানুষ দীর্ঘদিন ধরে একসাথে বসবাস করে আসছে। এই সহাবস্থান বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অতীতের অন্যায়গুলোর বিচার না হলে সেই সম্প্রীতি টেকসই হয় না। কারণ বিচারহীনতা ক্ষোভ জন্ম দেয়, বিভাজন তৈরি করে।ন্যায়বিচারই পারে সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে। বিচার মানে প্রতিশোধ নেয়া নয়, বিচার মানে সত্য উদঘাটন, প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি, এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা। তাই নাইক্ষ্যংছড়ি গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করা মানে শুধু অতীতের ক্ষত সারানো নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা।আজ ১৬ এপ্রিল, আমরা শুধু শোক প্রকাশ করছি না, আমরা আমাদের দাবি জানাচ্ছি। আমাদের দাবি স্পষ্ট ও দৃঢ়। নাইক্ষ্যংছড়ি গণহত্যার একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে। ঘটনার সাথে জড়িত সকল অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য যথাযথ ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। অপহৃত ও গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। এই গণহত্যাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিয়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় স্মরণ করতে হবে।এছাড়াও, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সহায়তা নিয়ে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত প্রক্রিয়া চালু করা যেতে পারে, যাতে সত্য উদঘাটন আরও বিশ্বাসযোগ্য হয়। প্রয়োজন হলে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে এই ঘটনার বিচার করা যেতে পারে, যাতে দীর্ঘসূত্রিতা দূর হয় এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত হয়।সবমিলিয়ে আমরা বলতে চাই, নাইক্ষ্যংছড়ির সেই রক্ত বৃথা যেতে পারে না। এই শহীদদের আত্মত্যাগ, এই নির্যাতিতদের কান্না, এসবের একটি মূল্য আছে। সেই মূল্য একদিন অবশ্যই দিতে হবে। আর তা ন্যায়বিচারের মাধ্যমে, সত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।এই গণহত্যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানবতা কতটা ভঙ্গুর হতে পারে, আর ন্যায়বিচার কতটা প্রয়োজনীয়। আমরা যদি এই ঘটনার বিচার নিশ্চিত করতে না পারি, তাহলে আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে দায়ী থাকব।রক্তের ঋণ কখনোই মুছে যায় না, তা সময়ের সাথে আরও গভীর হয়। এই ঋণ শোধ করার একমাত্র পথ হলো, ন্যায়বিচার। নাইক্ষ্যংছড়ির শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে আমরা আবারও বলি, বিচার চাই, ন্যায়বিচার চাই, এবং তা এখনই চাই।