বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাঁদের অবদান সময়ের পরিক্রমায় শুধু রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে থাকে না, বরং জাতির আত্মপরিচয়, রাষ্ট্রচিন্তা ও উন্নয়ন অভিযাত্রার অংশ হয়ে ওঠে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তেমনই এক ব্যক্তিত্ব। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার, সফল রাষ্ট্রপতি, সেনাবাহিনী প্রধান এবং জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা হিসেবে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম। তাঁর জীবন, কর্ম এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন আজও রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে আলোচিত হয়। তাঁর ৪৫তম শাহাদাত বার্ষিকীতে তাঁর দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ এবং দায়িত্ববোধের বিষয়গুলো নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিলো বাঙালি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। সেই সংকটময় সময়ে তিনি একজন পেশাদার সেনা কর্মকর্তা হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি দেশের স্বাধীনতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে ১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে তাঁর নেতৃত্ব মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করতে এবং যুদ্ধ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাঁর বীরত্ব, সাহসিকতা ও নেতৃত্বগুণের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি "বীর উত্তম" খেতাবে ভূষিত হন, যা বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক সম্মাননা।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ নানা রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। এমন এক সময়ে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে একটি নবীন রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে হলে শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয়, প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। ফলে তিনি উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, আত্মনির্ভরশীলতা এবং জাতীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিলো, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এই ধারণার মাধ্যমে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকদের একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করার চেষ্টা করেন। তাঁর মতে, ভাষা, ধর্ম, অঞ্চল কিংবা পেশাগত পার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য এবং বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। জাতীয় ঐক্যকে তিনি রাষ্ট্রের শক্তির মূল উৎস হিসেবে বিবেচনা করতেন। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিলো জনগণকে উন্নয়নের মূল শক্তি হিসেবে দেখা। তিনি বিশ্বাস করতেন যে উন্নয়ন কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক হলে একটি দেশ কখনোই টেকসই অগ্রগতি অর্জন করতে পারে না। তাই তিনি গ্রামীণ উন্নয়ন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা এবং তৃণমূল পর্যায়ের অংশগ্রহণকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে জনগণের কাছে রাষ্ট্রীয় সেবাকে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ তাঁর শাসনামলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিলো। স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব বিকাশ এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে জনগণের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তাঁর পদক্ষেপগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান স্মরণীয়। তিনি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে শিল্প খাতের সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর সময়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চারিত হয়, যা পরবর্তী উন্নয়ন অভিযাত্রার জন্য একটি ভিত্তি তৈরি করে।
দেশপ্রেম জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিত্বের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিলো। তাঁর দেশপ্রেম কেবল আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিলো দায়িত্ববোধ, কর্মপ্রচেষ্টা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার দৃঢ় অঙ্গীকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি বিশ্বাস করতেন যে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য প্রত্যেক নাগরিকের নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন। এই চিন্তাধারা তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত করার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর ভাষণ ও কর্মকাণ্ডে বারবার আত্মনির্ভরশীলতা, পরিশ্রম এবং জাতীয় দায়িত্ববোধের গুরুত্ব উঠে এসেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও জাতীয় সংহতির প্রশ্নেও তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলকে তিনি জাতীয় উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন, প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসারে গুরুত্ব দেন। পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকেও তিনি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতেন।
জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন যে জাতীয় সংহতি ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, সম্প্রদায় ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক ছিল জাতীয় অগ্রগতির অংশীদার। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক চিন্তাধারা আজও জাতীয় উন্নয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক বলে বিবেচিত হয়।
দায়িত্ববোধের প্রশ্নে জিয়াউর রহমান ছিলেন কর্মমুখী নেতৃত্বের প্রতীক। তিনি সংকটকে এড়িয়ে যাওয়ার পরিবর্তে মোকাবিলা করার পক্ষে ছিলেন। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তিনি শৃঙ্খলা, জবাবদিহিতা এবং কর্মনিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন সিদ্ধান্তে দায়িত্বশীল নেতৃত্বের প্রতিফলন দেখা যায়। অনেকের মতে, তাঁর নেতৃত্বের অন্যতম শক্তি ছিলো বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক মর্মান্তিক ঘটনায় তাঁর শাহাদাত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর অধ্যায়ের সূচনা করে। তাঁর মৃত্যু শুধু একটি রাজনৈতিক দলের জন্য নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর অবদান, দর্শন এবং রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
ইতিহাসে কোনো রাষ্ট্রনায়কের মূল্যায়ন কেবল তাঁর জীবদ্দশার কর্মকাণ্ড দিয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তাঁর চিন্তাধারা কতটা সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। জিয়াউর রহমানের ক্ষেত্রে দেখা যায়, দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ, আত্মনির্ভরশীলতা, উন্নয়ন এবং দায়িত্ববোধের যে বিষয়গুলো তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন, সেগুলো আজও রাষ্ট্র পরিচালনা ও জাতীয় উন্নয়নের আলোচনায় প্রাসঙ্গিক।
তাঁর ৪৫তম শাহাদাত বার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করার অর্থ কেবল একজন সাবেক রাষ্ট্রপতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো নয়, বরং দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ, জাতীয় ঐক্য এবং উন্নয়নমুখী রাষ্ট্রচিন্তার মূল্যবোধগুলোকে নতুন করে অনুধাবন করা। একটি শক্তিশালী, সমৃদ্ধ এবং আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন তিনি লালন করেছিলেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব আজকের ও আগামী প্রজন্মের।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতি, কর্ম ও আদর্শ বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনায়ক এবং জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা হিসেবে তাঁর অবদান জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। তাঁর জীবন থেকে দেশপ্রেম, কর্মনিষ্ঠা এবং জাতীয় দায়িত্ববোধের শিক্ষা গ্রহণ করাই হতে পারে তাঁর প্রতি সর্বোত্তম শ্রদ্ধা।
লেখক: এম মহাসিন মিয়া
সাংবাদিক, লেখক ও আঞ্চলিক গবেষক, পার্বত্য চট্টগ্রাম।

শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ মে ২০২৬
বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাঁদের অবদান সময়ের পরিক্রমায় শুধু রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে থাকে না, বরং জাতির আত্মপরিচয়, রাষ্ট্রচিন্তা ও উন্নয়ন অভিযাত্রার অংশ হয়ে ওঠে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তেমনই এক ব্যক্তিত্ব। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার, সফল রাষ্ট্রপতি, সেনাবাহিনী প্রধান এবং জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা হিসেবে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম। তাঁর জীবন, কর্ম এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন আজও রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে আলোচিত হয়। তাঁর ৪৫তম শাহাদাত বার্ষিকীতে তাঁর দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ এবং দায়িত্ববোধের বিষয়গুলো নতুন করে মূল্যায়নের দাবি রাখে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিলো বাঙালি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। সেই সংকটময় সময়ে তিনি একজন পেশাদার সেনা কর্মকর্তা হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি দেশের স্বাধীনতার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে ১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে তাঁর নেতৃত্ব মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করতে এবং যুদ্ধ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাঁর বীরত্ব, সাহসিকতা ও নেতৃত্বগুণের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি "বীর উত্তম" খেতাবে ভূষিত হন, যা বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক সম্মাননা।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ নানা রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। এমন এক সময়ে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে একটি নবীন রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে হলে শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয়, প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। ফলে তিনি উৎপাদনমুখী অর্থনীতি, আত্মনির্ভরশীলতা এবং জাতীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিলো, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এই ধারণার মাধ্যমে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকদের একটি অভিন্ন জাতীয় পরিচয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করার চেষ্টা করেন। তাঁর মতে, ভাষা, ধর্ম, অঞ্চল কিংবা পেশাগত পার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য এবং বাংলাদেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। জাতীয় ঐক্যকে তিনি রাষ্ট্রের শক্তির মূল উৎস হিসেবে বিবেচনা করতেন। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিলো জনগণকে উন্নয়নের মূল শক্তি হিসেবে দেখা। তিনি বিশ্বাস করতেন যে উন্নয়ন কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক হলে একটি দেশ কখনোই টেকসই অগ্রগতি অর্জন করতে পারে না। তাই তিনি গ্রামীণ উন্নয়ন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা এবং তৃণমূল পর্যায়ের অংশগ্রহণকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে জনগণের কাছে রাষ্ট্রীয় সেবাকে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ তাঁর শাসনামলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিলো। স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব বিকাশ এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে জনগণের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তাঁর পদক্ষেপগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান স্মরণীয়। তিনি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে শিল্প খাতের সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর সময়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি সঞ্চারিত হয়, যা পরবর্তী উন্নয়ন অভিযাত্রার জন্য একটি ভিত্তি তৈরি করে।
দেশপ্রেম জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিত্বের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিলো। তাঁর দেশপ্রেম কেবল আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিলো দায়িত্ববোধ, কর্মপ্রচেষ্টা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার দৃঢ় অঙ্গীকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তিনি বিশ্বাস করতেন যে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য প্রত্যেক নাগরিকের নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন। এই চিন্তাধারা তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত করার চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর ভাষণ ও কর্মকাণ্ডে বারবার আত্মনির্ভরশীলতা, পরিশ্রম এবং জাতীয় দায়িত্ববোধের গুরুত্ব উঠে এসেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও জাতীয় সংহতির প্রশ্নেও তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলকে তিনি জাতীয় উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন, প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসারে গুরুত্ব দেন। পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকেও তিনি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতেন।
জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন যে জাতীয় সংহতি ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই তিনি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, সম্প্রদায় ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিক ছিল জাতীয় অগ্রগতির অংশীদার। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক চিন্তাধারা আজও জাতীয় উন্নয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক বলে বিবেচিত হয়।
দায়িত্ববোধের প্রশ্নে জিয়াউর রহমান ছিলেন কর্মমুখী নেতৃত্বের প্রতীক। তিনি সংকটকে এড়িয়ে যাওয়ার পরিবর্তে মোকাবিলা করার পক্ষে ছিলেন। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তিনি শৃঙ্খলা, জবাবদিহিতা এবং কর্মনিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন সিদ্ধান্তে দায়িত্বশীল নেতৃত্বের প্রতিফলন দেখা যায়। অনেকের মতে, তাঁর নেতৃত্বের অন্যতম শক্তি ছিলো বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক মর্মান্তিক ঘটনায় তাঁর শাহাদাত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর অধ্যায়ের সূচনা করে। তাঁর মৃত্যু শুধু একটি রাজনৈতিক দলের জন্য নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর অবদান, দর্শন এবং রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।
ইতিহাসে কোনো রাষ্ট্রনায়কের মূল্যায়ন কেবল তাঁর জীবদ্দশার কর্মকাণ্ড দিয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তাঁর চিন্তাধারা কতটা সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। জিয়াউর রহমানের ক্ষেত্রে দেখা যায়, দেশপ্রেম, জাতীয়তাবাদ, আত্মনির্ভরশীলতা, উন্নয়ন এবং দায়িত্ববোধের যে বিষয়গুলো তিনি গুরুত্ব দিয়েছিলেন, সেগুলো আজও রাষ্ট্র পরিচালনা ও জাতীয় উন্নয়নের আলোচনায় প্রাসঙ্গিক।
তাঁর ৪৫তম শাহাদাত বার্ষিকীতে তাঁকে স্মরণ করার অর্থ কেবল একজন সাবেক রাষ্ট্রপতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো নয়, বরং দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ, জাতীয় ঐক্য এবং উন্নয়নমুখী রাষ্ট্রচিন্তার মূল্যবোধগুলোকে নতুন করে অনুধাবন করা। একটি শক্তিশালী, সমৃদ্ধ এবং আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন তিনি লালন করেছিলেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব আজকের ও আগামী প্রজন্মের।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতি, কর্ম ও আদর্শ বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, দায়িত্বশীল রাষ্ট্রনায়ক এবং জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা হিসেবে তাঁর অবদান জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। তাঁর জীবন থেকে দেশপ্রেম, কর্মনিষ্ঠা এবং জাতীয় দায়িত্ববোধের শিক্ষা গ্রহণ করাই হতে পারে তাঁর প্রতি সর্বোত্তম শ্রদ্ধা।
লেখক: এম মহাসিন মিয়া
সাংবাদিক, লেখক ও আঞ্চলিক গবেষক, পার্বত্য চট্টগ্রাম।

আপনার মতামত লিখুন