বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও অবাঙালি জনগোষ্ঠীর বসবাস দীর্ঘদিনের। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা এসব জনগোষ্ঠীর প্রত্যেকের রয়েছে স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক রীতি ও ঐতিহাসিক পরিচয়। তাদের অনেকেরই বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডের বাইরে বিভিন্ন অঞ্চলকে উৎসভূমি হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং বিভিন্ন সময়ের অভিবাসন, স্থানান্তর ও বসতি স্থাপনের মধ্য দিয়ে তারা বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছে।
জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে বসবাসরত অবাঙালি/ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যা ১৬ লাখ ৫০ হাজার ১৫৯ জন। নামোল্লেখিত ৫০টি জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ১৫ লাখ ৮১ হাজার ৬২১ জন, যা মোট অবাঙালি/ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রায় ৯৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ। অপরদিকে, অন্যান্য জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ৬৮ হাজার ৫৩৮ জন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ১৫ শতাংশ।
এই জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কয়েকটির উৎসভূমি, বাংলাদেশে আগমনের সময়কাল ও বসতি স্থাপনের ইতিহাস সম্পর্কে বিভিন্ন গবেষণা, নৃ-তাত্ত্বিক গ্রন্থ, বাংলাপিডিয়া, নৃগোষ্ঠীসনদ.গভ.বিডি, উইকিপিডিয়া এবং অন্যান্য প্রকাশনায় নানা তথ্য পাওয়া যায়। নিচে উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠীগুলোর পরিচয় ও ঐতিহাসিক বিস্তার তুলে ধরা হলো।
অহমিয়া/আসাম:
অহমিয়া বা আসামিয়া জনগোষ্ঠীর বর্তমান জনসংখ্যা আনুমানিক ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের বসবাস মূলত রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি এলাকায়। ঐতিহাসিক উৎসভূমি হিসেবে ভারতের আসামের কথা উল্লেখ করা হয়। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, উনিশ শতকে, বিশেষ করে ১৮৬০ সালের দিকে তাদের একটি অংশ বাংলাদেশে আসে। তাদের প্রধান ভাষা অহমিয়া।
অর্থাৎ, এই জনগোষ্ঠীর বর্তমান বাংলাদেশে উপস্থিতি মূলত আসাম অঞ্চল থেকে পরবর্তী সময়ের স্থানান্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লিখিত তথ্য থেকে ধারণা পাওয়া যায়।
খিয়াং:
খিয়াং জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ৪ হাজার ৮২৬ জন। তারা প্রধানত রাঙামাটি ও বান্দরবান পার্বত্য এলাকায় বসবাস করে। তাদের ঐতিহাসিক উৎসভূমি হিসেবে মিয়ানমারের আরাকান-ইয়োমা উপত্যকার উল্লেখ পাওয়া যায়।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৬০০ থেকে ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে খিয়াং জনগোষ্ঠীর একটি অংশ বর্তমান বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে আসে। তাদের ভাষা কুকি-চীন ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির সঙ্গে দীর্ঘদিনের বসবাস তাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেও বিশেষ বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছে।
খুমী:
খুমী জনগোষ্ঠীর বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৭৮০ জন। তাদের প্রধান বসতি বান্দরবানের রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচি এলাকায়।
উৎসভূমি হিসেবে মিয়ানমারের চিন প্রদেশের কথা উল্লেখ করা হয়। প্রদত্ত ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, সপ্তদশ শতকের শেষ দিকে খুমীদের একটি অংশ পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করে। তাদের ভাষা কুকি-চীন ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।
বর্তমানে বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতেই তাদের প্রধান বসতি গড়ে উঠেছে।
গুর্খা:
গুর্খা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আনুমানিক ১০০ জন। রাঙামাটি ও বান্দরবানের পাশাপাশি ঢাকা, বগুড়া, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা ও পটুয়াখালীতেও তাদের বসবাসের উল্লেখ পাওয়া যায়।
তাদের উৎসভূমি হিসেবে নেপাল ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলকে চিহ্নিত করা হয়। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৮৭১ সালের দিকে তাদের বাংলাদেশে আগমন ঘটে। তাদের প্রধান ভাষা নেপালি।
এ কারণে গুর্খাদের বাংলাদেশে বসতি অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক অভিবাসনপ্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লিখিত তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয়।
চাক:
চাক জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ৩ হাজার ৭৭ জন। তাদের প্রধান বসতি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায়।
তাদের উৎসভূমি হিসেবে হিমালয়ের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পামির মালভূমির উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দিকে চাক জনগোষ্ঠীর একটি অংশ বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রামে আসে।
তাদের ভাষাকে লুই ও তিব্বতি-বর্মী ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসের ফলে তাদের নিজস্ব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যও বিকশিত হয়েছে।
চাকমা:
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে চাকমারা অন্যতম বৃহৎ জনগোষ্ঠী। জনশুমারি-সংক্রান্ত প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, তাদের জনসংখ্যা ৪ লাখ ৮৩ হাজার ২৯৯ জন।
চাকমাদের প্রধান বসতি রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজার এলাকায়। তাদের উৎসভূমি সম্পর্কে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা রয়েছে। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ভারত অথবা মিয়ানমারের চম্পকনগরকে তাদের উৎসভূমি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ১৬৬০ সালের দিকে তাদের একটি অংশ বর্তমান বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে আসে।
চাকমা ভাষা তাদের স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সময়ের সঙ্গে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে এবং বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত।
তঞ্চঙ্গ্যা:
তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ৪৫ হাজার ৯৭২ জন। রাঙামাটি ও বান্দরবানের পাশাপাশি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া এবং কক্সবাজারের টেকনাফেও তাদের বসতি রয়েছে।
তাদের উৎসভূমি হিসেবে মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলকে উল্লেখ করা হয়। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৮১১ সালের দিকে তঞ্চঙ্গ্যাদের একটি অংশ বর্তমান বাংলাদেশে আসে। তাদের নিজস্ব ভাষা তঞ্চঙ্গ্যা।
ভৌগোলিক বিস্তারের দিক থেকে তঞ্চঙ্গ্যারা শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামেই সীমাবদ্ধ নয়; পার্বত্য ও উপকূলীয় এলাকার কিছু অংশেও তাদের বসতি গড়ে উঠেছে।
ত্রিপুরা:
ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ১ লাখ ৫৬ হাজার ৫৭৮ জন। রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির পাশাপাশি কুমিল্লা, সিলেট, চট্টগ্রাম, রাজবাড়ী, চাঁদপুর ও ফরিদপুরেও তাদের বসতির উল্লেখ রয়েছে।
ত্রিপুরাদের ইতিহাস দীর্ঘ ও বিস্তৃত। প্রদত্ত তথ্যে তাদের প্রাচীন উৎসের সঙ্গে চীনের ইয়াংসি ও হোয়াংহো নদীর উপত্যকার সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন স্থানান্তর ও বিস্তারের মধ্য দিয়ে তারা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষত ত্রিপুরা ও আসাম এলাকায় অবস্থান নেয় এবং পরে বর্তমান বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে।
তাদের ভাষা ককবরক। বাংলাদেশে বসবাসরত ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্য আজও স্বতন্ত্রভাবে বিদ্যমান।
পাংখোয়া:
পাংখোয়া জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ১ হাজার ৮৫৭ জন। তাদের বসতি মূলত রাঙামাটির বিলাইছড়ি, সাজেক, লংগদু, বরকল ও কাপ্তাই এলাকায়।
উৎসভূমি হিসেবে মিয়ানমারের চিন প্রদেশের উল্লেখ রয়েছে। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে পাংখোয়াদের একটি অংশ বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রামে আসে।
তাদের ভাষা পাংখোয়া। পার্বত্য পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের নিজস্ব জীবনযাপন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে।
বম:
বম জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ১৩ হাজার ১৯৩ জন। তাদের প্রধান বসতি রাঙামাটি ও বান্দরবান এলাকায়।
তাদের উৎসভূমি হিসেবে চীনের চিনলুং এলাকার কথা উল্লেখ করা হয়। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, সপ্তদশ শতকে বম জনগোষ্ঠীর একটি অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামে আসে।
তাদের ভাষা বম। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় দীর্ঘকাল বসবাসের ফলে তারা নিজেদের স্বতন্ত্র সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রেখেছে।
মারমা:
মারমা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ জনগোষ্ঠী। জনশুমারি-সংক্রান্ত প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, তাদের জনসংখ্যা ২ লাখ ২৪ হাজার ২৬১ জন।
রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে তাদের প্রধান বসতি। তাদের উৎসভূমি হিসেবে মিয়ানমারকে উল্লেখ করা হয়। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৭৮৪ সালের দিকে মারমাদের একটি অংশ বর্তমান বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে আসে।
তাদের ভাষা মারমা। পার্বত্য চট্টগ্রামের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক পরিমণ্ডলে মারমাদের দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি রয়েছে।
মুরুং বা ম্রো:
মুরুং বা ম্রো জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ৫২ হাজার ৪৫৫ জন। তাদের প্রধান বসতি বান্দরবান পার্বত্য জেলায়।
উৎসভূমি হিসেবে মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলের উল্লেখ রয়েছে। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে তাদের একটি অংশ বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে বসতি স্থাপন করে।
তাদের ভাষা ম্রো। বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ম্রো জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী বসতি ও জীবনধারা এখনও দৃশ্যমান।
লুসাই:
লুসাই জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা প্রায় ৩৮০ জন। রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে তাদের বসবাস রয়েছে।
তাদের উৎসভূমি হিসেবে ভারতের লুসাই হিলের কথা উল্লেখ করা হয়। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, কয়েক শতাব্দী আগে লুসাই জনগোষ্ঠীর একটি অংশ বর্তমান বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে আসে।
তাদের ভাষা লুসাই। সংখ্যায় তুলনামূলক ছোট হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে তাদের নিজস্ব অবস্থান রয়েছে।
কোচ:
কোচ জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ১৩ হাজার ৭০২ জন। তাদের বসতি মূলত বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের পাশাপাশি গাজীপুর, পাবনা, বগুড়া, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, জয়পুরহাট ও নওগাঁয় বিস্তৃত।
তাদের উৎসভূমি হিসেবে ভারতের কোচবিহারের কথা উল্লেখ করা হয়। কয়েক শতাব্দী আগে তারা বর্তমান বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করে বলে প্রদত্ত তথ্য থেকে জানা যায়।
তাদের ভাষা কোচ। ভৌগোলিকভাবে কোচ জনগোষ্ঠীর বিস্তার বাংলাদেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়।
গারো:
গারো জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ৭৬ হাজার ৮৪৬ জন। তাদের প্রধান বসতি বৃহত্তর ময়মনসিংহ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও গাজীপুর এলাকায়।
উৎসভূমি হিসেবে তিব্বত ও ভারতের গারো পাহাড়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, নবম থেকে দশম শতাব্দীর মধ্যে গারো জনগোষ্ঠীর স্থানান্তরের ইতিহাস শুরু হয়।
তাদের ভাষা মান্দি। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলে দীর্ঘকাল ধরে বসবাসের মাধ্যমে গারো জনগোষ্ঠী নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে।
হাজং:
হাজং জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ৭ হাজার ৯৯৬ জন। তাদের প্রধান বসতি শেরপুর, নেত্রকোনা, গাজীপুর ও সুনামগঞ্জ এলাকায়।
হাজংদের উৎস ও অভিবাসনের ইতিহাস সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, তাদের প্রাচীন উৎসের সঙ্গে চীনের হোয়াংহো নদীর উপত্যকা, তিব্বত, আসামের কামরূপ এবং বিহারের অবন্তিনগরের সম্পর্কের কথা বলা হয়। সপ্তদশ শতাব্দীতে তাদের বর্তমান বাংলাদেশের অঞ্চলে আগমনের উল্লেখ রয়েছে।
তাদের নিজস্ব ভাষা হাজং। উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় তাদের বসতি গড়ে উঠেছে।
খাসি বা খাসিয়া:
খাসি জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ১২ হাজার ৪২১ জন। তাদের বসতি প্রধানত সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ এলাকায়।
তাদের উৎসভূমি হিসেবে ভারতের আসাম অঞ্চলের উল্লেখ করা হয়েছে। প্রদত্ত তথ্যে তাদের বাংলাদেশে আগমনের সময়কাল প্রায় পাঁচ বছর আগে হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; তবে এই সময়কাল নিয়ে অন্যান্য ঐতিহাসিক ও নৃ-তাত্ত্বিক সূত্রে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যেতে পারে। ফলে বিষয়টি আরও যাচাইসাপেক্ষ।
খাসি ভাষা তাদের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মনিপুরি:
মনিপুরি জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ২২ হাজার ৯৭৮ জন। তাদের বসতি প্রধানত সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট ও হবিগঞ্জ এলাকায়।
তাদের উৎসভূমি ভারতের মনিপুর। প্রদত্ত ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮১৯ থেকে ১৮২৫ সালের মধ্যে মনিপুরি জনগোষ্ঠীর একটি অংশ বর্তমান বাংলাদেশে এসে বসতি স্থাপন করে।
মনিপুরি ভাষা ও সংস্কৃতি তাদের স্বতন্ত্র পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি। বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দৃশ্যমান উপস্থিতি রয়েছে।
রাখাইন:
রাখাইন জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ১১ হাজার ১৯৫ জন। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পটুয়াখালী ও বরগুনায় তাদের বসতি রয়েছে।
তাদের উৎসভূমি হিসেবে মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলকে উল্লেখ করা হয়। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৭৮৪ সালের দিকে রাখাইন জনগোষ্ঠীর একটি অংশ বর্তমান বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আসে।
রাখাইন ভাষা তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রধান উপাদান। উপকূলীয় অঞ্চলে বসতি স্থাপনের পর তারা স্থানীয় সমাজ ও অর্থনীতির সঙ্গে নিজেদের জীবনযাপনকে সংযুক্ত করে নেয়।
অভিবাসন ও বসতি স্থাপনের সামগ্রিক চিত্র:
উপরের তথ্যগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে বর্তমানে বসবাসরত বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ইতিহাস একরৈখিক নয়। তাদের উৎসভূমি হিসেবে ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, চীন, তিব্বতসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের নাম পাওয়া যায়। কেউ কয়েক শতাব্দী আগে এসেছে, কেউ আবার অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক সময়ে বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসতি স্থাপন করেছে।
বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের বসতির কারণে একটি বহুজাতিক ও বহুভাষিক সামাজিক অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। একইভাবে সিলেট, ময়মনসিংহ, উত্তরবঙ্গ ও বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকাতেও বিভিন্ন জনগোষ্ঠী নিজেদের স্বতন্ত্র বসতি গড়ে তুলেছে।
চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যা, গারো, কোচ, মনিপুরি, রাখাইনসহ প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর আগমন ও বসতি স্থাপনের ইতিহাস আলাদা। ফলে বাংলাদেশের জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে বোঝার জন্য প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ইতিহাস, স্থানান্তরের ধারা, ভাষা ও বসতির বিবর্তন আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতা মূলত বহু জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের ফল। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষের আগমন, স্থানান্তর ও বসতি স্থাপনের ধারাবাহিকতায় আজকের বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় জনবিন্যাস তৈরি হয়েছে। সেই ইতিহাসকে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করাই পারে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীগুলোর পরিচয় ও বসতি-ইতিহাসকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে।
লেখক: পার্বত্য চট্টগ্রাম

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও অবাঙালি জনগোষ্ঠীর বসবাস দীর্ঘদিনের। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা এসব জনগোষ্ঠীর প্রত্যেকের রয়েছে স্বতন্ত্র ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক রীতি ও ঐতিহাসিক পরিচয়। তাদের অনেকেরই বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডের বাইরে বিভিন্ন অঞ্চলকে উৎসভূমি হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং বিভিন্ন সময়ের অভিবাসন, স্থানান্তর ও বসতি স্থাপনের মধ্য দিয়ে তারা বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছে।
জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে বসবাসরত অবাঙালি/ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যা ১৬ লাখ ৫০ হাজার ১৫৯ জন। নামোল্লেখিত ৫০টি জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ১৫ লাখ ৮১ হাজার ৬২১ জন, যা মোট অবাঙালি/ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রায় ৯৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ। অপরদিকে, অন্যান্য জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ৬৮ হাজার ৫৩৮ জন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ১৫ শতাংশ।
এই জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কয়েকটির উৎসভূমি, বাংলাদেশে আগমনের সময়কাল ও বসতি স্থাপনের ইতিহাস সম্পর্কে বিভিন্ন গবেষণা, নৃ-তাত্ত্বিক গ্রন্থ, বাংলাপিডিয়া, নৃগোষ্ঠীসনদ.গভ.বিডি, উইকিপিডিয়া এবং অন্যান্য প্রকাশনায় নানা তথ্য পাওয়া যায়। নিচে উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠীগুলোর পরিচয় ও ঐতিহাসিক বিস্তার তুলে ধরা হলো।
অহমিয়া/আসাম:
অহমিয়া বা আসামিয়া জনগোষ্ঠীর বর্তমান জনসংখ্যা আনুমানিক ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের বসবাস মূলত রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি এলাকায়। ঐতিহাসিক উৎসভূমি হিসেবে ভারতের আসামের কথা উল্লেখ করা হয়। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, উনিশ শতকে, বিশেষ করে ১৮৬০ সালের দিকে তাদের একটি অংশ বাংলাদেশে আসে। তাদের প্রধান ভাষা অহমিয়া।
অর্থাৎ, এই জনগোষ্ঠীর বর্তমান বাংলাদেশে উপস্থিতি মূলত আসাম অঞ্চল থেকে পরবর্তী সময়ের স্থানান্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লিখিত তথ্য থেকে ধারণা পাওয়া যায়।
খিয়াং:
খিয়াং জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ৪ হাজার ৮২৬ জন। তারা প্রধানত রাঙামাটি ও বান্দরবান পার্বত্য এলাকায় বসবাস করে। তাদের ঐতিহাসিক উৎসভূমি হিসেবে মিয়ানমারের আরাকান-ইয়োমা উপত্যকার উল্লেখ পাওয়া যায়।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৬০০ থেকে ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে খিয়াং জনগোষ্ঠীর একটি অংশ বর্তমান বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে আসে। তাদের ভাষা কুকি-চীন ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির সঙ্গে দীর্ঘদিনের বসবাস তাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেও বিশেষ বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছে।
খুমী:
খুমী জনগোষ্ঠীর বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৭৮০ জন। তাদের প্রধান বসতি বান্দরবানের রুমা, রোয়াংছড়ি ও থানচি এলাকায়।
উৎসভূমি হিসেবে মিয়ানমারের চিন প্রদেশের কথা উল্লেখ করা হয়। প্রদত্ত ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, সপ্তদশ শতকের শেষ দিকে খুমীদের একটি অংশ পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করে। তাদের ভাষা কুকি-চীন ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।
বর্তমানে বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতেই তাদের প্রধান বসতি গড়ে উঠেছে।
গুর্খা:
গুর্খা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা আনুমানিক ১০০ জন। রাঙামাটি ও বান্দরবানের পাশাপাশি ঢাকা, বগুড়া, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা ও পটুয়াখালীতেও তাদের বসবাসের উল্লেখ পাওয়া যায়।
তাদের উৎসভূমি হিসেবে নেপাল ও ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলকে চিহ্নিত করা হয়। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৮৭১ সালের দিকে তাদের বাংলাদেশে আগমন ঘটে। তাদের প্রধান ভাষা নেপালি।
এ কারণে গুর্খাদের বাংলাদেশে বসতি অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক অভিবাসনপ্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে উল্লিখিত তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয়।
চাক:
চাক জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ৩ হাজার ৭৭ জন। তাদের প্রধান বসতি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকায়।
তাদের উৎসভূমি হিসেবে হিমালয়ের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পামির মালভূমির উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ষোড়শ শতাব্দীর শেষ দিকে চাক জনগোষ্ঠীর একটি অংশ বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রামে আসে।
তাদের ভাষাকে লুই ও তিব্বতি-বর্মী ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসের ফলে তাদের নিজস্ব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যও বিকশিত হয়েছে।
চাকমা:
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে চাকমারা অন্যতম বৃহৎ জনগোষ্ঠী। জনশুমারি-সংক্রান্ত প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, তাদের জনসংখ্যা ৪ লাখ ৮৩ হাজার ২৯৯ জন।
চাকমাদের প্রধান বসতি রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজার এলাকায়। তাদের উৎসভূমি সম্পর্কে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা রয়েছে। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ভারত অথবা মিয়ানমারের চম্পকনগরকে তাদের উৎসভূমি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ১৬৬০ সালের দিকে তাদের একটি অংশ বর্তমান বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে আসে।
চাকমা ভাষা তাদের স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সময়ের সঙ্গে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে এবং বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত।
তঞ্চঙ্গ্যা:
তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ৪৫ হাজার ৯৭২ জন। রাঙামাটি ও বান্দরবানের পাশাপাশি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া এবং কক্সবাজারের টেকনাফেও তাদের বসতি রয়েছে।
তাদের উৎসভূমি হিসেবে মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলকে উল্লেখ করা হয়। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৮১১ সালের দিকে তঞ্চঙ্গ্যাদের একটি অংশ বর্তমান বাংলাদেশে আসে। তাদের নিজস্ব ভাষা তঞ্চঙ্গ্যা।
ভৌগোলিক বিস্তারের দিক থেকে তঞ্চঙ্গ্যারা শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামেই সীমাবদ্ধ নয়; পার্বত্য ও উপকূলীয় এলাকার কিছু অংশেও তাদের বসতি গড়ে উঠেছে।
ত্রিপুরা:
ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ১ লাখ ৫৬ হাজার ৫৭৮ জন। রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির পাশাপাশি কুমিল্লা, সিলেট, চট্টগ্রাম, রাজবাড়ী, চাঁদপুর ও ফরিদপুরেও তাদের বসতির উল্লেখ রয়েছে।
ত্রিপুরাদের ইতিহাস দীর্ঘ ও বিস্তৃত। প্রদত্ত তথ্যে তাদের প্রাচীন উৎসের সঙ্গে চীনের ইয়াংসি ও হোয়াংহো নদীর উপত্যকার সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন স্থানান্তর ও বিস্তারের মধ্য দিয়ে তারা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষত ত্রিপুরা ও আসাম এলাকায় অবস্থান নেয় এবং পরে বর্তমান বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে।
তাদের ভাষা ককবরক। বাংলাদেশে বসবাসরত ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্য আজও স্বতন্ত্রভাবে বিদ্যমান।
পাংখোয়া:
পাংখোয়া জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ১ হাজার ৮৫৭ জন। তাদের বসতি মূলত রাঙামাটির বিলাইছড়ি, সাজেক, লংগদু, বরকল ও কাপ্তাই এলাকায়।
উৎসভূমি হিসেবে মিয়ানমারের চিন প্রদেশের উল্লেখ রয়েছে। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে পাংখোয়াদের একটি অংশ বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রামে আসে।
তাদের ভাষা পাংখোয়া। পার্বত্য পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের নিজস্ব জীবনযাপন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে।
বম:
বম জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ১৩ হাজার ১৯৩ জন। তাদের প্রধান বসতি রাঙামাটি ও বান্দরবান এলাকায়।
তাদের উৎসভূমি হিসেবে চীনের চিনলুং এলাকার কথা উল্লেখ করা হয়। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, সপ্তদশ শতকে বম জনগোষ্ঠীর একটি অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামে আসে।
তাদের ভাষা বম। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় দীর্ঘকাল বসবাসের ফলে তারা নিজেদের স্বতন্ত্র সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ধরে রেখেছে।
মারমা:
মারমা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ জনগোষ্ঠী। জনশুমারি-সংক্রান্ত প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, তাদের জনসংখ্যা ২ লাখ ২৪ হাজার ২৬১ জন।
রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে তাদের প্রধান বসতি। তাদের উৎসভূমি হিসেবে মিয়ানমারকে উল্লেখ করা হয়। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৭৮৪ সালের দিকে মারমাদের একটি অংশ বর্তমান বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে আসে।
তাদের ভাষা মারমা। পার্বত্য চট্টগ্রামের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক পরিমণ্ডলে মারমাদের দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি রয়েছে।
মুরুং বা ম্রো:
মুরুং বা ম্রো জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ৫২ হাজার ৪৫৫ জন। তাদের প্রধান বসতি বান্দরবান পার্বত্য জেলায়।
উৎসভূমি হিসেবে মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলের উল্লেখ রয়েছে। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে তাদের একটি অংশ বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে বসতি স্থাপন করে।
তাদের ভাষা ম্রো। বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ম্রো জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী বসতি ও জীবনধারা এখনও দৃশ্যমান।
লুসাই:
লুসাই জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা প্রায় ৩৮০ জন। রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে তাদের বসবাস রয়েছে।
তাদের উৎসভূমি হিসেবে ভারতের লুসাই হিলের কথা উল্লেখ করা হয়। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, কয়েক শতাব্দী আগে লুসাই জনগোষ্ঠীর একটি অংশ বর্তমান বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে আসে।
তাদের ভাষা লুসাই। সংখ্যায় তুলনামূলক ছোট হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যে তাদের নিজস্ব অবস্থান রয়েছে।
কোচ:
কোচ জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ১৩ হাজার ৭০২ জন। তাদের বসতি মূলত বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের পাশাপাশি গাজীপুর, পাবনা, বগুড়া, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর, জয়পুরহাট ও নওগাঁয় বিস্তৃত।
তাদের উৎসভূমি হিসেবে ভারতের কোচবিহারের কথা উল্লেখ করা হয়। কয়েক শতাব্দী আগে তারা বর্তমান বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করে বলে প্রদত্ত তথ্য থেকে জানা যায়।
তাদের ভাষা কোচ। ভৌগোলিকভাবে কোচ জনগোষ্ঠীর বিস্তার বাংলাদেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়।
গারো:
গারো জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ৭৬ হাজার ৮৪৬ জন। তাদের প্রধান বসতি বৃহত্তর ময়মনসিংহ, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও গাজীপুর এলাকায়।
উৎসভূমি হিসেবে তিব্বত ও ভারতের গারো পাহাড়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, নবম থেকে দশম শতাব্দীর মধ্যে গারো জনগোষ্ঠীর স্থানান্তরের ইতিহাস শুরু হয়।
তাদের ভাষা মান্দি। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলে দীর্ঘকাল ধরে বসবাসের মাধ্যমে গারো জনগোষ্ঠী নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে।
হাজং:
হাজং জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ৭ হাজার ৯৯৬ জন। তাদের প্রধান বসতি শেরপুর, নেত্রকোনা, গাজীপুর ও সুনামগঞ্জ এলাকায়।
হাজংদের উৎস ও অভিবাসনের ইতিহাস সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, তাদের প্রাচীন উৎসের সঙ্গে চীনের হোয়াংহো নদীর উপত্যকা, তিব্বত, আসামের কামরূপ এবং বিহারের অবন্তিনগরের সম্পর্কের কথা বলা হয়। সপ্তদশ শতাব্দীতে তাদের বর্তমান বাংলাদেশের অঞ্চলে আগমনের উল্লেখ রয়েছে।
তাদের নিজস্ব ভাষা হাজং। উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় তাদের বসতি গড়ে উঠেছে।
খাসি বা খাসিয়া:
খাসি জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ১২ হাজার ৪২১ জন। তাদের বসতি প্রধানত সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ এলাকায়।
তাদের উৎসভূমি হিসেবে ভারতের আসাম অঞ্চলের উল্লেখ করা হয়েছে। প্রদত্ত তথ্যে তাদের বাংলাদেশে আগমনের সময়কাল প্রায় পাঁচ বছর আগে হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; তবে এই সময়কাল নিয়ে অন্যান্য ঐতিহাসিক ও নৃ-তাত্ত্বিক সূত্রে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যেতে পারে। ফলে বিষয়টি আরও যাচাইসাপেক্ষ।
খাসি ভাষা তাদের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মনিপুরি:
মনিপুরি জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ২২ হাজার ৯৭৮ জন। তাদের বসতি প্রধানত সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট ও হবিগঞ্জ এলাকায়।
তাদের উৎসভূমি ভারতের মনিপুর। প্রদত্ত ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮১৯ থেকে ১৮২৫ সালের মধ্যে মনিপুরি জনগোষ্ঠীর একটি অংশ বর্তমান বাংলাদেশে এসে বসতি স্থাপন করে।
মনিপুরি ভাষা ও সংস্কৃতি তাদের স্বতন্ত্র পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি। বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দৃশ্যমান উপস্থিতি রয়েছে।
রাখাইন:
রাখাইন জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ১১ হাজার ১৯৫ জন। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পটুয়াখালী ও বরগুনায় তাদের বসতি রয়েছে।
তাদের উৎসভূমি হিসেবে মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলকে উল্লেখ করা হয়। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ১৭৮৪ সালের দিকে রাখাইন জনগোষ্ঠীর একটি অংশ বর্তমান বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে আসে।
রাখাইন ভাষা তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রধান উপাদান। উপকূলীয় অঞ্চলে বসতি স্থাপনের পর তারা স্থানীয় সমাজ ও অর্থনীতির সঙ্গে নিজেদের জীবনযাপনকে সংযুক্ত করে নেয়।
অভিবাসন ও বসতি স্থাপনের সামগ্রিক চিত্র:
উপরের তথ্যগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে বর্তমানে বসবাসরত বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ইতিহাস একরৈখিক নয়। তাদের উৎসভূমি হিসেবে ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, চীন, তিব্বতসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের নাম পাওয়া যায়। কেউ কয়েক শতাব্দী আগে এসেছে, কেউ আবার অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক সময়ে বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসতি স্থাপন করেছে।
বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের বসতির কারণে একটি বহুজাতিক ও বহুভাষিক সামাজিক অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। একইভাবে সিলেট, ময়মনসিংহ, উত্তরবঙ্গ ও বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকাতেও বিভিন্ন জনগোষ্ঠী নিজেদের স্বতন্ত্র বসতি গড়ে তুলেছে।
চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যা, গারো, কোচ, মনিপুরি, রাখাইনসহ প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর আগমন ও বসতি স্থাপনের ইতিহাস আলাদা। ফলে বাংলাদেশের জাতিগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে বোঝার জন্য প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ইতিহাস, স্থানান্তরের ধারা, ভাষা ও বসতির বিবর্তন আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতা মূলত বহু জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের সহাবস্থানের ফল। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষের আগমন, স্থানান্তর ও বসতি স্থাপনের ধারাবাহিকতায় আজকের বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় জনবিন্যাস তৈরি হয়েছে। সেই ইতিহাসকে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করাই পারে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীগুলোর পরিচয় ও বসতি-ইতিহাসকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে।
লেখক: পার্বত্য চট্টগ্রাম

আপনার মতামত লিখুন