চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশে আদিবাসীদের অস্তিত্ব শীর্ষক একটি সুদীর্ঘ নিবন্ধ প্রকাশ করেন। গত ১২ আগস্ট রাতে প্রকাশিত সেই নিবন্ধে তিনি জোর দাবি জানান যে, আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহ নিঃসন্দেহে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃত। তবে তাঁর এই দাবির পেছনে গভীর আইনি বিশ্লেষণ, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ কিংবা ঐতিহাসিক দলিলের সঠিক প্রতিফলন ঘটেনি। বস্তুত, তাঁর এই যুক্তিগুলো কেবল বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ গবেষণার ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠেনি, বরং এর পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও আন্তর্জাতিক আইনের সুবিধাজনক আংশিক ব্যাখ্যা কাজ করছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ১৬৯ নম্বর কনভেনশন উদ্ধৃত করে দেবাশীষ রায় দাবি করেছেন যে, সেখানে আদিবাসী ও উপজাতি শব্দদ্বয়ের মধ্যকার বৈষম্যকে অপ্রাসঙ্গিক করা হয়েছে। কিন্তু পরম বিস্ময়ের বিষয় হলো, একজন প্রবীণ আইনজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও তিনি আইএলও সনদের অনুচ্ছেদ ১ এর ধারা ১(a) ও ১(b) এর মৌলিক পার্থক্য সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছেন। সনদের ১(a) ধারায় উপজাতির সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, যাঁদের প্রথাগত ও সামাজিক অবস্থা জাতীয় জীবনের মূলধারা থেকে ভিন্ন, তাঁরাই উপজাতি। অন্যদিকে ১(b) ধারায় আদিবাসী হওয়ার পূর্বশর্ত হলো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রসীমানা গঠন বা ঔপনিবেশিক শাসনের আগে সেই ভূখণ্ডের মূল অধিবাসী হতে হবে।
পার্বত্য অঞ্চলের নৃতাত্ত্বিক ও সামাজিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে বসবাসরত উপজাতীয় জনগোষ্ঠীসমূহের বসবাসের সময়কাল কোনোভাবেই ৩০০ থেকে ৫০০ বছরের বেশি নয়। চাকমা রাজপরিবারের নিজস্ব ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থ রাজা ভুবন মোহন রায়ের "চাকমা রাজ বংশের ইতিহাস" এবং বিরাজ মোহন দেওয়ানের "চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত" বইয়ে পরিষ্কার উল্লেখ আছে যে চাকমারা মিয়ানমারের চম্পক নগর ও আরাকান অঞ্চল থেকে এখানে অভিবাসিত হয়েছে। পরবর্তীতে ১৬৩৮ সালে মারমা এবং ১৮ শতকে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর এই অঞ্চলে আগমন ঘটে। ফলে ঐতিহাসিক তথ্য নিশ্চিত করে যে তারা মূল ভূমিপুত্র নয়।
ব্রিটিশ শাসনামলের ঐতিহাসিক দলিল "পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০" বা CHT Regulation 1900 এর ৫২ নম্বর ধারায় স্পষ্টাক্ষরে এই পার্বত্য জনগোষ্ঠীসমূহকে অভিবাসী বা Migrants হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর বিপরীতে, এই সমগ্র বাংলায় বাঙালি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব বসতি স্থাপনের ইতিহাস অন্তত ২৫০০ থেকে ৩০০০ বছরের সুপ্রাচীন। ফলে আইএলও ১৬৯ এর ১(b) ধারা অনুযায়ী প্রথম বসতি স্থাপনকারী বা ভূমিপুত্র হওয়ার আন্তর্জাতিক শর্ত পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর ক্ষেত্রে একেবারেই প্রযোজ্য নয়। তাঁরা ধারা ১(a) অনুযায়ী পুরোপুরি উপজাতি, যা দেবাশীষ রায় কৌশলগতভাবে গোপন রেখে কেবল ১(b) এর রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র (UNDRIP) ২০০৭ কে দেবাশীষ রায় মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার সমতুল্য করার চেষ্টা করেছেন, যা অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর। বাংলাদেশ ২০০৭ সালে এই আইনগত ঘোষণাপত্রে সই করেনি এবং ভোটাভুটি থেকে সম্পূর্ণ বিরত ছিল। এর আইনি অর্থ হলো রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এই ঘোষণা মানতে বাধ্য নয়। এমনকি অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় শক্তিগুলোও শুরুতে এর বিপক্ষে অবস্থান নেয়। কারণ এই ঘোষণাপত্রের ৩, ৪, ৬ ও ৩০ অনুচ্ছেদে পৃথক স্বায়ত্তশাসন, আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় গণভোট এবং সেনা প্রত্যাহারের বিধান রাখা হয়েছে, যা জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য চরম হুমকি।
দেবাশীষ রায়ের বর্তমানের এই অতি-উৎসাহী অবস্থান তাঁর নিজের অতীতের দীর্ঘ প্রশাসনিক কার্যক্রম ও সরকারি অবস্থানের সাথেই ভীষণভাবে সাংঘর্ষিক। তিনি নিজেই ১৯৭৭ সাল থেকে সার্কেল চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় দাপ্তরিক নথিপত্রে এই জনগোষ্ঠীকে নিয়মিত উপজাতি হিসেবেই সম্বোধন করে এসেছেন। পরবর্তীতে ২০০৬-২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে তাঁর নিজস্ব স্বাক্ষরিত সরকারি চিঠিপত্রগুলোতেও উপজাতি শব্দটিই ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ নিজের অতীত কাজের সাথে তাঁর বর্তমান বক্তব্য কোনোভাবেই মেলে না।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আরও দেখা যায়, ১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সময়ে শান্তি সংহতি সমিতির (জেএসএস) নেতা সন্তু লারমাসহ উপজাতীয় প্রতিনিধিরা নিজেদের আনুষ্ঠানিকভাবে উপজাতি হিসেবেই স্বীকৃতি দিয়ে চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। উক্ত মূল চুক্তির দলিলে মোট ৫২ বার উপজাতি শব্দটির সুনির্দিষ্ট আইনি প্রয়োগ ঘটানো হয়েছিল। এছাড়া রাঙামাটির প্রাক্তন সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার জনসমক্ষে নিশ্চিত করেছিলেন যে, চুক্তি স্বাক্ষরের সময় দেবাশীষ রায় নিজেও স্বীকার করেছিলেন যে বাংলাদেশে আইনগতভাবে কেবল কিছু '
উপজাতি রয়েছে এবং কোনো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব নেই।
সুদীর্ঘ সময় ধরে দেবাশীষ রায় নিজেকে ও নিজের সার্কেলের জনগণকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রশাসনিক সুবিধা এবং কোটা প্রথা প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে উপজাতি পরিচয়েই উপস্থাপন করে এসেছেন। কিন্তু ২০০৭ সালে জাতিসংঘের UNDRIP পাশ হওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অর্থায়ন গ্রহণ এবং ভূ-রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বায়ত্তশাসনের বড় সুবিধা পাওয়ার লক্ষ্যেই তিনি রাতারাতি নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে আদিবাসী পরিভাষার মূল সমর্থক বনে যান। দেবাশীষ রায়ের এই আকস্মিক ও সুবিধাজনক অবস্থান বদল তাঁর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং সুবিধাবাদী মনস্তাত্ত্বিক রূপকেই দেশের সর্বসাধারণের সামনে উন্মোচিত করে দেয়।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানে ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর অধিকার সুরক্ষিত রাখা হয়েছে। সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে রাষ্ট্র তার দেশের উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায় এর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও পরিচর্যা করবে। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার ২০১১ ও ২০২২ সালে প্রজ্ঞাপন জারি করে যেকোনো নথিপত্রে আদিবাসী শব্দের অসাংবিধানিক ও বেআইনি ব্যবহার বন্ধের কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। সংবিধানের এই স্পষ্ট বিধান লঙ্ঘন করে বিভ্রান্তিকর পরিভাষা ব্যবহারের প্রচার চালানো রাষ্ট্রীয় মূলনীতির পরিপন্থী।
সার্বিক পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট যে ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়ের নিবন্ধে উপস্থাপিত যুক্তিগুলো কোনো গভীর আইনি প্রজ্ঞা কিংবা ঐতিহাসিক সত্যের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সনদের মনগড়া ও সুবিধাজনক অপব্যাখ্যা এবং নিজের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের শতভাগ বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিয়ে তিনি যে আদিবাসী বয়ান তৈরির প্রয়াস চালাচ্ছেন, তা ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ ও আন্তর্জাতিক আইনের কঠোর কষ্টিপাথরে একটি সম্পূর্ণ অসত্য, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।
লেখক: এম এম রাহমান

সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ আগস্ট ২০২৬
চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায় সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশে আদিবাসীদের অস্তিত্ব শীর্ষক একটি সুদীর্ঘ নিবন্ধ প্রকাশ করেন। গত ১২ আগস্ট রাতে প্রকাশিত সেই নিবন্ধে তিনি জোর দাবি জানান যে, আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহ নিঃসন্দেহে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃত। তবে তাঁর এই দাবির পেছনে গভীর আইনি বিশ্লেষণ, প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ কিংবা ঐতিহাসিক দলিলের সঠিক প্রতিফলন ঘটেনি। বস্তুত, তাঁর এই যুক্তিগুলো কেবল বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ গবেষণার ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠেনি, বরং এর পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও আন্তর্জাতিক আইনের সুবিধাজনক আংশিক ব্যাখ্যা কাজ করছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ১৬৯ নম্বর কনভেনশন উদ্ধৃত করে দেবাশীষ রায় দাবি করেছেন যে, সেখানে আদিবাসী ও উপজাতি শব্দদ্বয়ের মধ্যকার বৈষম্যকে অপ্রাসঙ্গিক করা হয়েছে। কিন্তু পরম বিস্ময়ের বিষয় হলো, একজন প্রবীণ আইনজ্ঞ হওয়া সত্ত্বেও তিনি আইএলও সনদের অনুচ্ছেদ ১ এর ধারা ১(a) ও ১(b) এর মৌলিক পার্থক্য সম্পূর্ণ এড়িয়ে গেছেন। সনদের ১(a) ধারায় উপজাতির সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, যাঁদের প্রথাগত ও সামাজিক অবস্থা জাতীয় জীবনের মূলধারা থেকে ভিন্ন, তাঁরাই উপজাতি। অন্যদিকে ১(b) ধারায় আদিবাসী হওয়ার পূর্বশর্ত হলো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রসীমানা গঠন বা ঔপনিবেশিক শাসনের আগে সেই ভূখণ্ডের মূল অধিবাসী হতে হবে।
পার্বত্য অঞ্চলের নৃতাত্ত্বিক ও সামাজিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে বসবাসরত উপজাতীয় জনগোষ্ঠীসমূহের বসবাসের সময়কাল কোনোভাবেই ৩০০ থেকে ৫০০ বছরের বেশি নয়। চাকমা রাজপরিবারের নিজস্ব ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থ রাজা ভুবন মোহন রায়ের "চাকমা রাজ বংশের ইতিহাস" এবং বিরাজ মোহন দেওয়ানের "চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত" বইয়ে পরিষ্কার উল্লেখ আছে যে চাকমারা মিয়ানমারের চম্পক নগর ও আরাকান অঞ্চল থেকে এখানে অভিবাসিত হয়েছে। পরবর্তীতে ১৬৩৮ সালে মারমা এবং ১৮ শতকে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর এই অঞ্চলে আগমন ঘটে। ফলে ঐতিহাসিক তথ্য নিশ্চিত করে যে তারা মূল ভূমিপুত্র নয়।
ব্রিটিশ শাসনামলের ঐতিহাসিক দলিল "পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০" বা CHT Regulation 1900 এর ৫২ নম্বর ধারায় স্পষ্টাক্ষরে এই পার্বত্য জনগোষ্ঠীসমূহকে অভিবাসী বা Migrants হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর বিপরীতে, এই সমগ্র বাংলায় বাঙালি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব বসতি স্থাপনের ইতিহাস অন্তত ২৫০০ থেকে ৩০০০ বছরের সুপ্রাচীন। ফলে আইএলও ১৬৯ এর ১(b) ধারা অনুযায়ী প্রথম বসতি স্থাপনকারী বা ভূমিপুত্র হওয়ার আন্তর্জাতিক শর্ত পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর ক্ষেত্রে একেবারেই প্রযোজ্য নয়। তাঁরা ধারা ১(a) অনুযায়ী পুরোপুরি উপজাতি, যা দেবাশীষ রায় কৌশলগতভাবে গোপন রেখে কেবল ১(b) এর রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র (UNDRIP) ২০০৭ কে দেবাশীষ রায় মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার সমতুল্য করার চেষ্টা করেছেন, যা অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর। বাংলাদেশ ২০০৭ সালে এই আইনগত ঘোষণাপত্রে সই করেনি এবং ভোটাভুটি থেকে সম্পূর্ণ বিরত ছিল। এর আইনি অর্থ হলো রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এই ঘোষণা মানতে বাধ্য নয়। এমনকি অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় শক্তিগুলোও শুরুতে এর বিপক্ষে অবস্থান নেয়। কারণ এই ঘোষণাপত্রের ৩, ৪, ৬ ও ৩০ অনুচ্ছেদে পৃথক স্বায়ত্তশাসন, আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় গণভোট এবং সেনা প্রত্যাহারের বিধান রাখা হয়েছে, যা জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য চরম হুমকি।
দেবাশীষ রায়ের বর্তমানের এই অতি-উৎসাহী অবস্থান তাঁর নিজের অতীতের দীর্ঘ প্রশাসনিক কার্যক্রম ও সরকারি অবস্থানের সাথেই ভীষণভাবে সাংঘর্ষিক। তিনি নিজেই ১৯৭৭ সাল থেকে সার্কেল চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় দাপ্তরিক নথিপত্রে এই জনগোষ্ঠীকে নিয়মিত উপজাতি হিসেবেই সম্বোধন করে এসেছেন। পরবর্তীতে ২০০৬-২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হিসেবে তাঁর নিজস্ব স্বাক্ষরিত সরকারি চিঠিপত্রগুলোতেও উপজাতি শব্দটিই ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ নিজের অতীত কাজের সাথে তাঁর বর্তমান বক্তব্য কোনোভাবেই মেলে না।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আরও দেখা যায়, ১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সময়ে শান্তি সংহতি সমিতির (জেএসএস) নেতা সন্তু লারমাসহ উপজাতীয় প্রতিনিধিরা নিজেদের আনুষ্ঠানিকভাবে উপজাতি হিসেবেই স্বীকৃতি দিয়ে চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। উক্ত মূল চুক্তির দলিলে মোট ৫২ বার উপজাতি শব্দটির সুনির্দিষ্ট আইনি প্রয়োগ ঘটানো হয়েছিল। এছাড়া রাঙামাটির প্রাক্তন সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদার জনসমক্ষে নিশ্চিত করেছিলেন যে, চুক্তি স্বাক্ষরের সময় দেবাশীষ রায় নিজেও স্বীকার করেছিলেন যে বাংলাদেশে আইনগতভাবে কেবল কিছু '
উপজাতি রয়েছে এবং কোনো আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব নেই।
সুদীর্ঘ সময় ধরে দেবাশীষ রায় নিজেকে ও নিজের সার্কেলের জনগণকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রশাসনিক সুবিধা এবং কোটা প্রথা প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে উপজাতি পরিচয়েই উপস্থাপন করে এসেছেন। কিন্তু ২০০৭ সালে জাতিসংঘের UNDRIP পাশ হওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর অর্থায়ন গ্রহণ এবং ভূ-রাজনৈতিক ও সামাজিক স্বায়ত্তশাসনের বড় সুবিধা পাওয়ার লক্ষ্যেই তিনি রাতারাতি নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে আদিবাসী পরিভাষার মূল সমর্থক বনে যান। দেবাশীষ রায়ের এই আকস্মিক ও সুবিধাজনক অবস্থান বদল তাঁর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং সুবিধাবাদী মনস্তাত্ত্বিক রূপকেই দেশের সর্বসাধারণের সামনে উন্মোচিত করে দেয়।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন সংবিধানে ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলোর অধিকার সুরক্ষিত রাখা হয়েছে। সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে যে রাষ্ট্র তার দেশের উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায় এর সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও পরিচর্যা করবে। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার ২০১১ ও ২০২২ সালে প্রজ্ঞাপন জারি করে যেকোনো নথিপত্রে আদিবাসী শব্দের অসাংবিধানিক ও বেআইনি ব্যবহার বন্ধের কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। সংবিধানের এই স্পষ্ট বিধান লঙ্ঘন করে বিভ্রান্তিকর পরিভাষা ব্যবহারের প্রচার চালানো রাষ্ট্রীয় মূলনীতির পরিপন্থী।
সার্বিক পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট যে ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়ের নিবন্ধে উপস্থাপিত যুক্তিগুলো কোনো গভীর আইনি প্রজ্ঞা কিংবা ঐতিহাসিক সত্যের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সনদের মনগড়া ও সুবিধাজনক অপব্যাখ্যা এবং নিজের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের শতভাগ বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিয়ে তিনি যে আদিবাসী বয়ান তৈরির প্রয়াস চালাচ্ছেন, তা ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ ও আন্তর্জাতিক আইনের কঠোর কষ্টিপাথরে একটি সম্পূর্ণ অসত্য, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।
লেখক: এম এম রাহমান

আপনার মতামত লিখুন