আজ পবিত্র ১২ রবিউল আউয়াল। মুসলিম বিশ্বের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ দিন—পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের স্মৃতিবিজড়িত এই দিনটি বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে।
ইসলামি ঐতিহ্য ও প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, ১২ রবিউল আউয়াল মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং একই তারিখে মদিনায় ইন্তেকাল করেন। বাংলাদেশে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৪৪৮ হিজরির ১২ রবিউল আউয়াল ২৬ আগস্ট ২০২৬ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালিত হচ্ছে। দিনটি সরকারি ছুটির দিন হিসেবেও পালিত হচ্ছে।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ইসলামের সর্বশেষ নবী ও রাসুল। তাঁর আগমন ছিল মানবজাতির ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। তিনি মানুষকে এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন, সত্য ও ন্যায়ের পথে চলা, অন্যায়-অবিচার পরিহার, দুর্বল ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দিয়েছেন।
তাঁর জীবন ও কর্মে ফুটে উঠেছে সততা, আমানতদারি, ক্ষমাশীলতা, সহনশীলতা, ন্যায়বিচার, দয়া, মানবিকতা ও পরোপকারের অনন্য দৃষ্টান্ত। তাই মহানবী (সা.) শুধু মুসলমানদের জন্যই নন, সমগ্র মানবজাতির জন্য শান্তি, ন্যায় ও মানবিকতার এক মহান আদর্শ।
জাহেলিয়াতের অন্ধকারে আলোর বার্তা
মহানবী (সা.) এমন এক সময়ে পৃথিবীতে আগমন করেন, যখন তৎকালীন আরব সমাজ নানা কুসংস্কার, পৌত্তলিকতা, গোত্রীয় সংঘাত, সামাজিক বৈষম্য, অন্যায়-অবিচার ও নৈতিক অবক্ষয়ে জর্জরিত ছিল। ইতিহাসে সেই সময়কে ‘আইয়ামে জাহেলিয়া’ বা অজ্ঞতার যুগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
গোত্রীয় সংঘাত ও প্রতিশোধের সংস্কৃতি সমাজজীবনে গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল। দুর্বল ও অসহায় মানুষের অধিকার ছিল অনিরাপদ। নারী ও শিশুদের প্রতিও নানা ধরনের অবিচার করা হতো। ধনী ও শক্তিশালীরা সমাজে অধিক প্রভাবশালী ছিল এবং দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের প্রতি অবহেলা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।
এমন অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে মহানবী (সা.) তাওহিদের বাণী নিয়ে পৃথিবীতে আগমন করেন। তিনি মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান জানান এবং সত্য, ন্যায়, সাম্য, দয়া, ক্ষমা ও মানবিক মর্যাদার শিক্ষা প্রচার করেন।
তাঁর প্রচারের ফলে মানুষের চিন্তা, নৈতিকতা ও সামাজিক জীবনে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা হয়। মানুষ বুঝতে শেখে—বংশ, গোত্র, সম্পদ কিংবা ক্ষমতা নয়; বরং নৈতিকতা, তাকওয়া ও সৎকর্মই মানুষের প্রকৃত মর্যাদার ভিত্তি।
জন্ম ও শৈশব
ইসলামি ইতিহাসের প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা নগরীর সম্মানিত কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আবদুল্লাহ এবং মা আমিনা।
জন্মের আগেই মহানবী (সা.) তাঁর পিতাকে হারান। মাত্র ছয় বছর বয়সে তাঁর মা আমিনাও ইন্তেকাল করেন। এরপর তিনি প্রথমে তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব এবং পরে চাচা আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন।
এতিম অবস্থায় বেড়ে উঠলেও শৈশব থেকেই তাঁর চরিত্রে সততা, বিশ্বস্ততা, সংযম, বিনয়, সৌজন্য ও মানবিকতার অনন্য প্রকাশ ঘটেছিল। তাঁর সত্যবাদিতা ও আমানতদারিতে মক্কার মানুষ এতটাই আস্থাশীল ছিল যে তাঁকে ‘আল-আমিন’—অর্থাৎ ‘বিশ্বস্ত’—উপাধিতে অভিহিত করত।
ওহি নাজিল ও নবুওয়াতের সূচনা
৪০ বছর বয়সে মক্কার হেরা গুহায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর প্রথম ওহি নাজিল হয়। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর নবুওয়াতের মহান দায়িত্ব।
প্রথম ওহির পর তিনি মানুষকে আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন, সত্য ও ন্যায়ের পথে জীবন পরিচালনা এবং অন্যায়, জুলুম ও শোষণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
তিনি মিথ্যা, প্রতারণা, অন্যায়, জুলুম, বৈষম্য ও মানুষের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেন। একই সঙ্গে দরিদ্র, এতিম, অসহায়, মিসকিন ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেন।
তাঁর আদর্শে পরিবার, প্রতিবেশী, নারী, শিশু, এতিম, দরিদ্র ও সমাজের দুর্বল মানুষের অধিকার বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি মানুষকে শুধু ইবাদতের শিক্ষা দেননি; বরং মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ, দায়িত্বশীলতা ও মানবিকতার শিক্ষা দিয়েছেন।
মক্কার নির্যাতন ও মদিনায় হিজরত
মক্কায় ইসলাম প্রচারের সময় মহানবী (সা.) ও তাঁর অনুসারীদের কঠিন নির্যাতন ও নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। ইসলামের সত্য ও ন্যায়ের বার্তা প্রচারের কারণে তাঁকে নানা ধরনের বাধা ও অত্যাচার সহ্য করতে হয়।
তবে কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি ধৈর্য, ক্ষমা ও শান্তির পথ থেকে বিচ্যুত হননি। পরবর্তীতে আল্লাহর নির্দেশে তিনি মদিনায় হিজরত করেন।
মদিনায় গিয়ে মহানবী (সা.) একটি ন্যায়ভিত্তিক, সুশৃঙ্খল ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। সেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের পারস্পরিক অধিকার, দায়িত্ব, সহাবস্থান ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে সামাজিক কাঠামো গড়ে ওঠে।
মহানবী (সা.)—মানবতার শ্রেষ্ঠ আদর্শ
মহানবী (সা.)-এর জীবন ছিল মানবতার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। তিনি মানুষের প্রতি দয়া করতে বলেছেন, প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষার শিক্ষা দিয়েছেন এবং এতিম-দরিদ্র ও অসহায়দের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি ক্ষমাকে প্রতিশোধের চেয়ে উত্তম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। শত্রুর প্রতিও মানবিক আচরণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর জীবনে ক্ষমা, সহনশীলতা ও উদারতার অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে।
তাঁর শিক্ষা মানুষকে বিভেদ নয়, ভ্রাতৃত্বের দিকে আহ্বান জানায়; ঘৃণা নয়, ভালোবাসার দিকে আহ্বান জানায়; প্রতিশোধ নয়, ক্ষমার শিক্ষা দেয়; অন্যায় নয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠার পথ দেখায়।
বিদায় হজ ও মানবাধিকারের শিক্ষা
মহানবী (সা.)-এর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বিদায় হজ। বিদায় হজের ভাষণে তিনি মানুষের জীবন, সম্পদ ও মর্যাদার নিরাপত্তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মানবিক মর্যাদা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক অধিকারের বিষয়ে তাঁর শিক্ষা আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, সংঘাত, বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতার মধ্যে বিদায় হজের শিক্ষা মানবতার জন্য শান্তি ও ন্যায়ের পথনির্দেশ দিতে পারে। ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে আয়োজিত জাতীয় অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতিও বিদায় হজের এসব শিক্ষার সমকালীন গুরুত্বের কথা তুলে ধরেছেন।
২৩ বছরের নবুওয়াতি জীবন
দীর্ঘ ২৩ বছর নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করে মহানবী (সা.) মানবজাতির কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেন। তাঁর জীবন ছিল সত্য ও ন্যায়ের সংগ্রাম, মানবতার কল্যাণ এবং আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়নের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
৬৩ বছর বয়সে মদিনায় মহানবী (সা.) ইন্তেকাল করেন। তাঁর ওফাত মুসলিম উম্মাহর জন্য গভীর শোকের ঘটনা হলেও তাঁর রেখে যাওয়া কোরআন ও সুন্নাহ আজও মুসলমানদের জীবন পরিচালনার প্রধান পথনির্দেশ।
ইবাদত-বন্দেগিতে পালিত হচ্ছে পবিত্র দিন
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা দিনটি বিভিন্ন ইবাদত-বন্দেগির মধ্য দিয়ে পালন করছেন।
কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ পাঠ, নফল নামাজ, দোয়া-মোনাজাত, জিকির, দান-খয়রাত এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে অনেকে দিনটি পালন করছেন। বিভিন্ন স্থানে মিলাদ মাহফিল, ওয়াজ মাহফিল, আলোচনা সভা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসা, ইসলামি প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় সংগঠনের উদ্যোগে মহানবী (সা.)-এর জীবন, কর্ম ও শিক্ষা নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
দেশজুড়ে সরকারি ও ধর্মীয় কর্মসূচি
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে সরকার দেশব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি ভবন ও সশস্ত্র বাহিনীর স্থাপনায় জাতীয় পতাকা উত্তোলনের কর্মসূচিও রয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন মসজিদে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত, আলোচনা সভা এবং মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির বাণী
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশবাসী ও বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়কে শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানিয়েছেন।
বাণীতে তিনি মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, সহনশীলতা, ভালোবাসা ও মানবিকতার আদর্শ অনুসরণ করে হিংসা, বিদ্বেষ, বিভেদ ও অন্যায় পরিহারের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে শান্তি, সম্প্রীতি, সাম্য ও মানবিকতার ভিত্তিতে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, সংঘাত, হিংসা, বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতা মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তাকে ব্যাহত করছে। এমন পরিস্থিতিতে মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায় ও মানবিকতার শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রীর বাণী
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও দেশবাসী ও বিশ্বের মুসলিম উম্মাহকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
তিনি মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, ক্ষমা, সহমর্মিতা ও মানবিকতার আদর্শ অনুসরণ করে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ন্যায় ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মহানবী (সা.)-এর জীবন ও কর্ম থেকে শিক্ষা নিয়ে শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। তিনি এতিম, দরিদ্র, অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন।
পরিবার, প্রতিবেশী, নারী, শিশু এবং সমাজের দুর্বল ও পিছিয়ে থাকা মানুষের অধিকার রক্ষায় মহানবী (সা.) যে গুরুত্ব দিয়েছেন, তা অনুসরণের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি আরও বলেন, মহানবী (সা.)-এর আদর্শ মানুষে মানুষে বিভেদ দূর করে ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধকে শক্তিশালী করে। তাঁর জীবনাদর্শ অনুসরণ করে একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষকালব্যাপী আয়োজন
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে রাজধানীতে পক্ষকালব্যাপী বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে ‘সিরাতুন্নবী (সা.)’ শীর্ষক পক্ষকালব্যাপী কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়েছে। এতে মহানবী (সা.)-এর জীবন, কর্ম, আদর্শ ও মানবতার জন্য তাঁর অবদান নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
আয়োজনের মধ্যে রয়েছে মাহফিল, সম্মেলন, সেমিনার, আলোচনা সভা, কবিতা পাঠ, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, প্রকাশনা ও প্রদর্শনী। পাশাপাশি ইসলামি বইমেলাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক আয়োজনও রয়েছে।
এসব অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করা এবং তাঁর শিক্ষা ব্যক্তি ও সমাজজীবনে বাস্তবায়নে উদ্বুদ্ধ করা।
নতুন প্রজন্মের জন্য মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা
বর্তমান সময়ে নতুন প্রজন্ম নানা ধরনের সামাজিক ও নৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। মাদক, অপরাধ, সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা ও সামাজিক অবক্ষয় থেকে তরুণদের দূরে রাখতে মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীও তাঁর বাণীতে তরুণ প্রজন্মকে মহানবী (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে মাদক, সন্ত্রাস, উগ্রবাদ ও অপরাধ থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
সততা, পরিশ্রম, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ, অন্যের প্রতি সম্মান ও মানবিকতার শিক্ষা তরুণদের ব্যক্তিজীবন ও ভবিষ্যৎ সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, আদর্শ বাস্তবায়নের দিন
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) শুধু আনুষ্ঠানিকতা পালনের দিন নয়; বরং মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ নিজেদের জীবনে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করার দিন।
তাঁর প্রতি ভালোবাসার প্রকৃত বহিঃপ্রকাশ হতে পারে তাঁর শিক্ষা অনুসরণ করা। সত্য কথা বলা, আমানত রক্ষা করা, মানুষের অধিকার সম্মান করা, অন্যায় থেকে বিরত থাকা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করা এবং ক্ষমা ও সহনশীলতার চর্চা করা—এসবই তাঁর মহান আদর্শের অংশ।
আজকের দিনে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা বাস্তবায়ন করতে পারলে একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ আরও সুগম হবে।
শান্তি ও মানবতার বার্তা ছড়িয়ে পড়ুক
বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, সংঘাত, সহিংসতা, বৈষম্য, বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতা যখন মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তাকে বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলছে, তখন মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, ক্ষমা, সহমর্মিতা ও মানবিকতার শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
তাঁর আদর্শ মানুষকে বিভক্ত নয়, ঐক্যবদ্ধ হতে শেখায়। ঘৃণার পরিবর্তে ভালোবাসা, প্রতিহিংসার পরিবর্তে ক্ষমা, অন্যায়ের পরিবর্তে ন্যায় এবং বৈষম্যের পরিবর্তে সাম্য প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেয়।
মহানবী (সা.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি আমরা আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সত্য, ন্যায়, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তাহলেই পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালনের প্রকৃত তাৎপর্য আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হবে।
বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমন মানবতার ইতিহাসে এক অনন্য আলোকবর্তিকার আবির্ভাব। তাঁর জীবন ও শিক্ষা আজও কোটি কোটি মানুষের জন্য সত্য, ন্যায়, শান্তি ও মানবিকতার পথনির্দেশ।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) আমাদের মনে মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা আরও গভীর করুক। তাঁর সুন্নাহ ও আদর্শ অনুসরণ করে ব্যক্তি জীবনে সততা, পরিবারে ভালোবাসা, সমাজে ন্যায়বিচার এবং মানুষের প্রতি সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠার শক্তি দান করুক।
হিংসা, বিদ্বেষ, বিভেদ ও অন্যায় দূর হয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হোক শান্তি, সম্প্রীতি, সাম্য ও মানবিকতা—এই হোক পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর দিনে আমাদের প্রত্যাশা।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে দেশবাসী ও বিশ্বের সকল মুসলমানকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন, সুন্নাহ ও মহান আদর্শ অনুসরণ করে জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমিন।

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ আগস্ট ২০২৬
আজ পবিত্র ১২ রবিউল আউয়াল। মুসলিম বিশ্বের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ দিন—পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম ও ওফাতের স্মৃতিবিজড়িত এই দিনটি বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে।
ইসলামি ঐতিহ্য ও প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, ১২ রবিউল আউয়াল মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং একই তারিখে মদিনায় ইন্তেকাল করেন। বাংলাদেশে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৪৪৮ হিজরির ১২ রবিউল আউয়াল ২৬ আগস্ট ২০২৬ পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালিত হচ্ছে। দিনটি সরকারি ছুটির দিন হিসেবেও পালিত হচ্ছে।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ইসলামের সর্বশেষ নবী ও রাসুল। তাঁর আগমন ছিল মানবজাতির ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। তিনি মানুষকে এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন, সত্য ও ন্যায়ের পথে চলা, অন্যায়-অবিচার পরিহার, দুর্বল ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং পারস্পরিক ভালোবাসা ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দিয়েছেন।
তাঁর জীবন ও কর্মে ফুটে উঠেছে সততা, আমানতদারি, ক্ষমাশীলতা, সহনশীলতা, ন্যায়বিচার, দয়া, মানবিকতা ও পরোপকারের অনন্য দৃষ্টান্ত। তাই মহানবী (সা.) শুধু মুসলমানদের জন্যই নন, সমগ্র মানবজাতির জন্য শান্তি, ন্যায় ও মানবিকতার এক মহান আদর্শ।
জাহেলিয়াতের অন্ধকারে আলোর বার্তা
মহানবী (সা.) এমন এক সময়ে পৃথিবীতে আগমন করেন, যখন তৎকালীন আরব সমাজ নানা কুসংস্কার, পৌত্তলিকতা, গোত্রীয় সংঘাত, সামাজিক বৈষম্য, অন্যায়-অবিচার ও নৈতিক অবক্ষয়ে জর্জরিত ছিল। ইতিহাসে সেই সময়কে ‘আইয়ামে জাহেলিয়া’ বা অজ্ঞতার যুগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
গোত্রীয় সংঘাত ও প্রতিশোধের সংস্কৃতি সমাজজীবনে গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল। দুর্বল ও অসহায় মানুষের অধিকার ছিল অনিরাপদ। নারী ও শিশুদের প্রতিও নানা ধরনের অবিচার করা হতো। ধনী ও শক্তিশালীরা সমাজে অধিক প্রভাবশালী ছিল এবং দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের প্রতি অবহেলা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।
এমন অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে মহানবী (সা.) তাওহিদের বাণী নিয়ে পৃথিবীতে আগমন করেন। তিনি মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান জানান এবং সত্য, ন্যায়, সাম্য, দয়া, ক্ষমা ও মানবিক মর্যাদার শিক্ষা প্রচার করেন।
তাঁর প্রচারের ফলে মানুষের চিন্তা, নৈতিকতা ও সামাজিক জীবনে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা হয়। মানুষ বুঝতে শেখে—বংশ, গোত্র, সম্পদ কিংবা ক্ষমতা নয়; বরং নৈতিকতা, তাকওয়া ও সৎকর্মই মানুষের প্রকৃত মর্যাদার ভিত্তি।
জন্ম ও শৈশব
ইসলামি ইতিহাসের প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা নগরীর সম্মানিত কুরাইশ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আবদুল্লাহ এবং মা আমিনা।
জন্মের আগেই মহানবী (সা.) তাঁর পিতাকে হারান। মাত্র ছয় বছর বয়সে তাঁর মা আমিনাও ইন্তেকাল করেন। এরপর তিনি প্রথমে তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিব এবং পরে চাচা আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন।
এতিম অবস্থায় বেড়ে উঠলেও শৈশব থেকেই তাঁর চরিত্রে সততা, বিশ্বস্ততা, সংযম, বিনয়, সৌজন্য ও মানবিকতার অনন্য প্রকাশ ঘটেছিল। তাঁর সত্যবাদিতা ও আমানতদারিতে মক্কার মানুষ এতটাই আস্থাশীল ছিল যে তাঁকে ‘আল-আমিন’—অর্থাৎ ‘বিশ্বস্ত’—উপাধিতে অভিহিত করত।
ওহি নাজিল ও নবুওয়াতের সূচনা
৪০ বছর বয়সে মক্কার হেরা গুহায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর প্রথম ওহি নাজিল হয়। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর নবুওয়াতের মহান দায়িত্ব।
প্রথম ওহির পর তিনি মানুষকে আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন, সত্য ও ন্যায়ের পথে জীবন পরিচালনা এবং অন্যায়, জুলুম ও শোষণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
তিনি মিথ্যা, প্রতারণা, অন্যায়, জুলুম, বৈষম্য ও মানুষের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেন। একই সঙ্গে দরিদ্র, এতিম, অসহায়, মিসকিন ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেন।
তাঁর আদর্শে পরিবার, প্রতিবেশী, নারী, শিশু, এতিম, দরিদ্র ও সমাজের দুর্বল মানুষের অধিকার বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি মানুষকে শুধু ইবাদতের শিক্ষা দেননি; বরং মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ, দায়িত্বশীলতা ও মানবিকতার শিক্ষা দিয়েছেন।
মক্কার নির্যাতন ও মদিনায় হিজরত
মক্কায় ইসলাম প্রচারের সময় মহানবী (সা.) ও তাঁর অনুসারীদের কঠিন নির্যাতন ও নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। ইসলামের সত্য ও ন্যায়ের বার্তা প্রচারের কারণে তাঁকে নানা ধরনের বাধা ও অত্যাচার সহ্য করতে হয়।
তবে কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি ধৈর্য, ক্ষমা ও শান্তির পথ থেকে বিচ্যুত হননি। পরবর্তীতে আল্লাহর নির্দেশে তিনি মদিনায় হিজরত করেন।
মদিনায় গিয়ে মহানবী (সা.) একটি ন্যায়ভিত্তিক, সুশৃঙ্খল ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। সেখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের পারস্পরিক অধিকার, দায়িত্ব, সহাবস্থান ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে সামাজিক কাঠামো গড়ে ওঠে।
মহানবী (সা.)—মানবতার শ্রেষ্ঠ আদর্শ
মহানবী (সা.)-এর জীবন ছিল মানবতার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। তিনি মানুষের প্রতি দয়া করতে বলেছেন, প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষার শিক্ষা দিয়েছেন এবং এতিম-দরিদ্র ও অসহায়দের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
তিনি ক্ষমাকে প্রতিশোধের চেয়ে উত্তম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। শত্রুর প্রতিও মানবিক আচরণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর জীবনে ক্ষমা, সহনশীলতা ও উদারতার অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে।
তাঁর শিক্ষা মানুষকে বিভেদ নয়, ভ্রাতৃত্বের দিকে আহ্বান জানায়; ঘৃণা নয়, ভালোবাসার দিকে আহ্বান জানায়; প্রতিশোধ নয়, ক্ষমার শিক্ষা দেয়; অন্যায় নয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠার পথ দেখায়।
বিদায় হজ ও মানবাধিকারের শিক্ষা
মহানবী (সা.)-এর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বিদায় হজ। বিদায় হজের ভাষণে তিনি মানুষের জীবন, সম্পদ ও মর্যাদার নিরাপত্তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মানবিক মর্যাদা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক অধিকারের বিষয়ে তাঁর শিক্ষা আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, সংঘাত, বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতার মধ্যে বিদায় হজের শিক্ষা মানবতার জন্য শান্তি ও ন্যায়ের পথনির্দেশ দিতে পারে। ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে আয়োজিত জাতীয় অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতিও বিদায় হজের এসব শিক্ষার সমকালীন গুরুত্বের কথা তুলে ধরেছেন।
২৩ বছরের নবুওয়াতি জীবন
দীর্ঘ ২৩ বছর নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করে মহানবী (সা.) মানবজাতির কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেন। তাঁর জীবন ছিল সত্য ও ন্যায়ের সংগ্রাম, মানবতার কল্যাণ এবং আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়নের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
৬৩ বছর বয়সে মদিনায় মহানবী (সা.) ইন্তেকাল করেন। তাঁর ওফাত মুসলিম উম্মাহর জন্য গভীর শোকের ঘটনা হলেও তাঁর রেখে যাওয়া কোরআন ও সুন্নাহ আজও মুসলমানদের জীবন পরিচালনার প্রধান পথনির্দেশ।
ইবাদত-বন্দেগিতে পালিত হচ্ছে পবিত্র দিন
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা দিনটি বিভিন্ন ইবাদত-বন্দেগির মধ্য দিয়ে পালন করছেন।
কোরআন তিলাওয়াত, দরুদ পাঠ, নফল নামাজ, দোয়া-মোনাজাত, জিকির, দান-খয়রাত এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে অনেকে দিনটি পালন করছেন। বিভিন্ন স্থানে মিলাদ মাহফিল, ওয়াজ মাহফিল, আলোচনা সভা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসা, ইসলামি প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় সংগঠনের উদ্যোগে মহানবী (সা.)-এর জীবন, কর্ম ও শিক্ষা নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
দেশজুড়ে সরকারি ও ধর্মীয় কর্মসূচি
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে সরকার দেশব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি ভবন ও সশস্ত্র বাহিনীর স্থাপনায় জাতীয় পতাকা উত্তোলনের কর্মসূচিও রয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন মসজিদে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত, আলোচনা সভা এবং মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির বাণী
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশবাসী ও বিশ্বের মুসলিম সম্প্রদায়কে শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ জানিয়েছেন।
বাণীতে তিনি মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, সহনশীলতা, ভালোবাসা ও মানবিকতার আদর্শ অনুসরণ করে হিংসা, বিদ্বেষ, বিভেদ ও অন্যায় পরিহারের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে শান্তি, সম্প্রীতি, সাম্য ও মানবিকতার ভিত্তিতে ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, সংঘাত, হিংসা, বৈষম্য ও অসহিষ্ণুতা মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তাকে ব্যাহত করছে। এমন পরিস্থিতিতে মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায় ও মানবিকতার শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রীর বাণী
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও দেশবাসী ও বিশ্বের মুসলিম উম্মাহকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
তিনি মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, ক্ষমা, সহমর্মিতা ও মানবিকতার আদর্শ অনুসরণ করে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ন্যায় ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মহানবী (সা.)-এর জীবন ও কর্ম থেকে শিক্ষা নিয়ে শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। তিনি এতিম, দরিদ্র, অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন।
পরিবার, প্রতিবেশী, নারী, শিশু এবং সমাজের দুর্বল ও পিছিয়ে থাকা মানুষের অধিকার রক্ষায় মহানবী (সা.) যে গুরুত্ব দিয়েছেন, তা অনুসরণের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি আরও বলেন, মহানবী (সা.)-এর আদর্শ মানুষে মানুষে বিভেদ দূর করে ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধকে শক্তিশালী করে। তাঁর জীবনাদর্শ অনুসরণ করে একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষকালব্যাপী আয়োজন
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে রাজধানীতে পক্ষকালব্যাপী বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে ‘সিরাতুন্নবী (সা.)’ শীর্ষক পক্ষকালব্যাপী কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়েছে। এতে মহানবী (সা.)-এর জীবন, কর্ম, আদর্শ ও মানবতার জন্য তাঁর অবদান নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
আয়োজনের মধ্যে রয়েছে মাহফিল, সম্মেলন, সেমিনার, আলোচনা সভা, কবিতা পাঠ, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, প্রকাশনা ও প্রদর্শনী। পাশাপাশি ইসলামি বইমেলাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক আয়োজনও রয়েছে।
এসব অনুষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করা এবং তাঁর শিক্ষা ব্যক্তি ও সমাজজীবনে বাস্তবায়নে উদ্বুদ্ধ করা।
নতুন প্রজন্মের জন্য মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা
বর্তমান সময়ে নতুন প্রজন্ম নানা ধরনের সামাজিক ও নৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। মাদক, অপরাধ, সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা ও সামাজিক অবক্ষয় থেকে তরুণদের দূরে রাখতে মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীও তাঁর বাণীতে তরুণ প্রজন্মকে মহানবী (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করে মাদক, সন্ত্রাস, উগ্রবাদ ও অপরাধ থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
সততা, পরিশ্রম, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ, অন্যের প্রতি সম্মান ও মানবিকতার শিক্ষা তরুণদের ব্যক্তিজীবন ও ভবিষ্যৎ সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, আদর্শ বাস্তবায়নের দিন
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) শুধু আনুষ্ঠানিকতা পালনের দিন নয়; বরং মহানবী (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ নিজেদের জীবনে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করার দিন।
তাঁর প্রতি ভালোবাসার প্রকৃত বহিঃপ্রকাশ হতে পারে তাঁর শিক্ষা অনুসরণ করা। সত্য কথা বলা, আমানত রক্ষা করা, মানুষের অধিকার সম্মান করা, অন্যায় থেকে বিরত থাকা, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করা এবং ক্ষমা ও সহনশীলতার চর্চা করা—এসবই তাঁর মহান আদর্শের অংশ।
আজকের দিনে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা বাস্তবায়ন করতে পারলে একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার পথ আরও সুগম হবে।
শান্তি ও মানবতার বার্তা ছড়িয়ে পড়ুক
বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, সংঘাত, সহিংসতা, বৈষম্য, বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতা যখন মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তাকে বারবার প্রশ্নের মুখে ফেলছে, তখন মহানবী (সা.)-এর শান্তি, ন্যায়, ক্ষমা, সহমর্মিতা ও মানবিকতার শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
তাঁর আদর্শ মানুষকে বিভক্ত নয়, ঐক্যবদ্ধ হতে শেখায়। ঘৃণার পরিবর্তে ভালোবাসা, প্রতিহিংসার পরিবর্তে ক্ষমা, অন্যায়ের পরিবর্তে ন্যায় এবং বৈষম্যের পরিবর্তে সাম্য প্রতিষ্ঠার শিক্ষা দেয়।
মহানবী (সা.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি আমরা আমাদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সত্য, ন্যায়, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করতে পারি, তাহলেই পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পালনের প্রকৃত তাৎপর্য আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব হবে।
বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আগমন মানবতার ইতিহাসে এক অনন্য আলোকবর্তিকার আবির্ভাব। তাঁর জীবন ও শিক্ষা আজও কোটি কোটি মানুষের জন্য সত্য, ন্যায়, শান্তি ও মানবিকতার পথনির্দেশ।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) আমাদের মনে মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা আরও গভীর করুক। তাঁর সুন্নাহ ও আদর্শ অনুসরণ করে ব্যক্তি জীবনে সততা, পরিবারে ভালোবাসা, সমাজে ন্যায়বিচার এবং মানুষের প্রতি সহমর্মিতা প্রতিষ্ঠার শক্তি দান করুক।
হিংসা, বিদ্বেষ, বিভেদ ও অন্যায় দূর হয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হোক শান্তি, সম্প্রীতি, সাম্য ও মানবিকতা—এই হোক পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.)-এর দিনে আমাদের প্রত্যাশা।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে দেশবাসী ও বিশ্বের সকল মুসলমানকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ।
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন, সুন্নাহ ও মহান আদর্শ অনুসরণ করে জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমিন।

আপনার মতামত লিখুন