শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ঢাকা
চ্যানেল সিএইচটি

১৯০০ সালের হিল ট্র্যাক্টস বিধি যেভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের ভূমির অধিকার খর্ব করেছে।



১৯০০ সালের হিল ট্র্যাক্টস বিধি যেভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের ভূমির অধিকার খর্ব করেছে।

মূল টপিক্সে যাওয়ার আগে জেনে নিই, হিল ট্র্যাক্টস রেজুলেশন ১৯০০ বলতে কি বোঝায়? "হিল ট্র্যাক্টস রেগুলেশন ১৯০০" হলো এমন একটি আইন, যা বৃটিশ কর্তৃক ১৯০০ সালে প্রণীত হয়েছিল। মূলত বৃটিশ সরকার যখন ভারতবর্ষ (বর্তমান ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ) শাসন করছিল তখন পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা করে প্রশাসন কার্যের সুবিধার্থে একটি বিশেষ বিশেষ আইন বা রেগুলেশন জারি করে। এর নাম ছিল "হিল ট্র্যাক্স রেজুলেশন ১৯০০"।

এবার আসুন জেনে নি, পার্বত্য চট্টগ্রামে বৃটিশ কতৃক প্রণীত এই আইনের মূল বৈশিষ্ট্য গুলো কি। প্রশাসনিক কাঠামো, Forest ও Resource Control, জমি ও বসতি আইন,আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থা,বহিরাগত প্রবেশ সীমাবদ্ধতা,সাধারণ জনগণের অধিকার সীমিতকরণ। মূলত এই ৬টি বৈশিষ্ঠের উপর ভিত্তি করেই পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন অঞ্চল হিসেবে শাষনকার্য পরিচালনার জন বৃটিশরা এই আইন প্রণীত করে।

বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি ও বাঙালি উভয় জনগণ এই আইনের বিরোধীতা কেনো করছে? এর মূল কারণ হচ্ছে এই আইন বর্তমান বাংলাদেশে সংবিধান বিরোধী, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির সম্মুখীন। কারণ গুলো হচ্ছে এই আইনে বলা হয়েছে- 'উপজাতীয়দের জন্য আলাদা রাজা/চিফ ও সার্কেল চিফদের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থা'। একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আমাদের একটি সংবিধান আছে, একজন রাষ্ট্রপতি আছে, একজন প্রধানমন্ত্রী আছে, প্রতিটি জেলায় সরকারের রিপ্রেজেনটেটিভ একজন জেলা প্রসাশন আছে এবং একজন সংসদ সদস্য আছে। এর বাহিরে গিয়ে GenZ এর এই যুগে 'রাজা' নামক ১৯০০ সালের প্রথা এখনো চালু থাকবে এটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। শাষন করার জন্য উপরে উল্লেখিত সরকারি রিপ্রেজেনটেটিভ কিংবা প্রধানমন্ত্রী আছে। যিনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। তবুও কেনো পার্বত্য চট্টগ্রামে আলাদা এক রাজার হাতে প্রসাশনিক ব্যবস্থা,ভূমি মালিকানা ব্যবস্থা থাকবে? 

ভূমির মালিকানা ব্যবস্থা রাজাদের হাতে থাকার ফলে সংবিধান লংঘন তো হয়েছেই সেই সাথে আরোও একটি বড় সমস্যা যেটি হয়েছে তা হলো 'বাঙালিরা নিজ দেশে পরবাসী ও অধিকার হারা হয়েছে'। বৃটিশ প্রণীত হিল ট্র্যাক্টস রেগুলেশন ১৯০০ সালের আইন অনুযায়ি ৩ পার্বত্য জেলায় ৩টি সার্কেল। সার্কেল প্রধানদের বলা হয় 'রাজা'। তাহলে রাজা আছেন ৩ জন। খাগড়াছড়ির সার্কেলের নাম মং সার্কেল, রাঙামাটি সার্কেলের নাম চাকমা সার্কেল এবং বান্দরবান সার্কেলের নাম বোমাং সার্কেল। ৩ সার্কেল প্রধান,অর্থ্যাৎ ৩ জেলার রাজা'ই হচ্ছেন উপজাতি।

এবার মূল টপিক্সে আসা যাক। ১৯০০ সালের হিল ট্র্যাক্টস ম্যানুয়েল ৩৪ নং বিধির (১১) ও (১২) উপবিধি মতে, যে ব্যক্তি সরাসরি সরকারের কাছ থেকে জমি বন্দোবস্ত পেয়েছে (কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে নয়), তার সেই জমির উপর একটা "স্থায়ী ও উত্তরাধিকারযোগ্য" অধিকার থাকবে। মানে সে নিজে যতদিন খুশি ভোগ করতে পারবে, আর মারা গেলে তার ছেলেমেয়েরাও সেই অধিকার পাবে। কিন্তু এই অধিকারটা "শর্তসাপেক্ষে"। শর্তটা হলো পরের বিধিতে (১২) বলা আছে। সেই শর্তটাই হলো ডেপুটি কমিশনার চাইলে যেকোনো সময় সেই জমির মালিককে উচ্ছেদ করতে পারবেন, বা জমিটা ফিরিয়ে নিতে পারবেন। 

তাহলে বাস্তবে এর মানে দাঁড়ায়: এটা প্রকৃত মালিকানা নয়। যেমন আপনি একটা জমি কিনে পুরোপুরি নিজের নামে রেজিস্ট্রি করলে যা হয়। বরং এটা একধরনের স্থায়ী প্রজাস্বত্ব আপনি দখলে রাখতে ও ব্যবহার করতে পারবেন, উত্তরাধিকারসূত্রে সন্তানদের দিতে পারবেন, কিন্তু জমির উপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ থেকে যায় সরকার কিংবা ডিসির হাতে। সরকার কিংবা ডেপুটি কমিশনার ইচ্ছা করলে যেকোনো সময় সেই জমি থেকে উচ্ছেদ করতে বা জমি ফিরিয়ে নিতে পারেন। এটাই মূলত সেই ধারণাটার আইনি ভিত্তি যে "ব্যবহার করা যাবে, কিন্তু প্রকৃত মালিক হওয়া যাবে না" কারণ চূড়ান্ত মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ থেকে যাচ্ছে রাষ্ট্রের হাতে, ব্যক্তির হাতে নয়।

পরবর্তীতে ১৯৫০ সালে "রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০" The State Acquisition and Tenancy Act, 1950 পাস করে বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব বাংলা) জমিদারি ও মধ্যস্বত্বাধিকার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে দেয়। বর্তমানে আমাদের দেশে জমি যে কিনে সেই জমির প্রকৃত মালিক হয়। কিন্ত ৩ পার্বত্য জেলা চলছে সেই ১৯০০ সালের ম্যানুয়েলের মাধ্যমে৷ সাধারণ উপজাতিরা আজও বুঝতে পারেনি এই ম্যানুয়েল তাদের অধিকার খর্ব করেছে এবং সার্কেল চীফদের 'রাজা' উপাধি দিয়ে মূলা ঝুলিয়ে রাখার মতন সান্তনা দিয়েছে ইংরেজরা। 

সার্কেল প্রধানদের আরোও যেভাবে খুশি রাখা হয়ঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধিমালা ১৯০০ কার্যকর করার মাধ্যমে তিন পার্বত্য জেলার সার্কেল প্রধানদের রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সার্কেল চীফকে রাজস্ব আদায়ের এবং নিজ নিজ এলাকার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। সার্কেলগুলো নিয়ে জেলাকে তিনটি মহকুমায় (রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও রামগড়) বিভক্ত করা হয় এবং মহকুমা প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়। তাদেরকে সার্কেল চীফের কার্যাবলী তদারকী ও লিঁয়াজো করার দায়িত্ব দেয়া হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধিমালাকে একটা অন্যতম দলিল হিসেবে পাহাড়িরা গণ্য করে থাকে, যদিও ওই বিধিমালার বেশির ভাগ ধারা ছিল উপজাতীয়দের জন্য অবমাননাকর। বিধি অনুসারে গোটা পার্বত্য জেলার বিধাতা বনে যান জেলা প্রশাসক বা ডেপুটি কমিশনার। যিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে থেকে ইংরেজ কতৃক নিযুক্ত হবেন। সেখানে পার্বত্য অঞ্চলে জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া বাইরের কেউ সেখানে যেতে বা বসতি স্থাপন করতে পারবে না। কিন্তু কেন নিষিদ্ধ ছিল, তা উপজাতি অ্যাক্টিভিস্ট কিংবা সুশীলরা উল্ল্যেখ করেন না। এই বাক্যটি উপজাতি নেতারা খুব সচেতনভাবে এড়িয়ে যান।

এই বিধিমালায় পার্বত্য চট্টগ্রামকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করে ওই এলাকার বাসিন্দাদের নাগরিক অধিকার বঞ্চিত আশ্রিত জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এছাড়া তাদের ভূমি অধিকার ছিল না। উপজাতীয় কারবারিদের শুধু যাযাবর জুম চাষের পাঁচসালা বিলি ব্যবস্থা ও বন্য প্রাণী রক্ষণাবেক্ষণের ভার দেয়া হয়। বাঙালিদের দেখাদেখি খুবই সামান্য সংখ্যক উপজাতীয় হালচাষ রপ্ত করে। বিধিমালায় স্পষ্ট করে লেখা ছিল উপজাতীয়রা পঁচিশ বিঘা জমি ব্যাবহার করতে পারবে, কিন্তু জমির মালিক হতে পারবে না। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ১৭৯৩ সালে ব্রিটিশ প্রতিনিধি লর্ড কর্ণওয়ালিশ কর্তৃক ভারত উপমহাদেশে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা কার্যকরী থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন উপজাতীয় প্রধানকে জমিদারি স্বত্ব দেয়া হয়নি। শুধু সার্কেল চীফ বা রাজা খেতাব দিয়ে তাদের খুশি রাখা হয়েছিল। সার্কেল চীফ বা রাজার ক্ষমতা ছিল কেবল খাজনা আদায় করার। তখনকার সময় এর আর্থিক মূল্য থাকলেও এখন সেই মূল্য নামে মাত্র। নামে মাত্র মূল্যের সেই খাজনা এখনও রাজপরিবার আদায় করেন।

পার্বত্য এলাকা ‘নন-রেগুলেটেড এরিয়া’ বা ‘অনিয়ন্ত্রিত’ এলাকা হিসেবে ঘোষিত হয়, যেখানে জেলা প্রশাসকের অনুমতি ব্যাতিত কেউ প্রবেশ করতে কিংবা বসতি স্থাপন করতে পারবে না। উপজাতীয়রা পঁচিশ বিঘা জমি ব্যাবহার করতে পারবে, কিন্তু মালিক হতে পারবে না। বিচারালয়ে কোন উকিল থাকবে না। সার্কেল চীফ (রাজা), হেডম্যান ও কারবারিরা থাকবে। দরকার হলে উপজাতীয়রা বিনা পারিশ্রমিকে সরকারি কর্মকর্তাদের চাহিদা মোতাবেক কাজ করে দিতে বাধ্য থাকবে। সার্কেল চীফ (রাজা), হেডম্যান এমনকি কারবারিরাও তাঁর অধীনস্থ উপজাতীয়দের খাটাতে পারবে কোন পারিশ্রমিক না দিয়েই। এই বিধিগুলো সাধারন পাহাড়িদের উপকার করবে, নাকি এলিটদের?

১৯০০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের দেয়া হয় হাট-বাজারের দায়িত্ব। এ জন্যই পার্বত্য চট্টগ্রামে যে ক্ষুদ্র পরিমান উন্নয়ন হয়েছে, দেশের অন্যান্য অংশের সাথে যেই ক্ষুদ্র হলেও তাল মিলিয়ে চলতে ফিরতে পারছে এই অঞ্চল, তার প্রায় সিংহভাগ কৃত্তিত্ব বাঙালিদের। আইনী দিক বিবেচনায় বলতে হয়, ১৯২০ সালে স্বয়ং ব্রিটিশ সরকার উপজাতীয় কুকীদের নিয়ন্ত্রনে এনে পার্বত্য চট্টগ্রামকে এক্সক্লুসিভ এরিয়া ঘোষণা দিয়ে সেখানে বহিরাগতদের আগমন প্রক্রিয়া সহজ করেছিল। এই বিধিমালা যারা প্রনয়ন করেছিল তারাই এই বিধিমালার মধ্যে যেই বিশেষ বিধিটির প্রতি বর্তমানে পাহাড়ি নেতাদের প্রচন্ড আগ্রহ তা বাতিল করেছিল। এমনকি পাকিস্তান সরকার সাধারন পাহাড়িদের স্বার্থে এই বিধিমালাই একবার বাতিল করেছিল, পরে বিভক্তি আনয়নের জন্য এটি আবার চালু করে। (সূত্রঃ শরবিন্দু চাকমা, মুক্তিযুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রাম)।

পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন ১৯৮৯ (১৯৮৯ সনের ১৯, ২০ ও ২১নং আইন) সংশোধিত রাঙ্গামাটি/খাগড়াছড়ি/বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৯৮ (১৯৯৮ সনের ৯, ১০ ও ১১নং আইন) কার্যকর হওয়ার পর ৬৪ ধারায় (শান্তি চুক্তির খ খন্ডের ২৬ ধারা) পার্বত্য জেলা পরিষদের নিকট ভূমি সংক্রান্ত যে কোন ক্রয়-বিক্রয়, পরিবর্তন বা অধিগ্রহণের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশান ১৯০০ কার্যকর থাকায় ভূমি সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। ২রা ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে পার্বত্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে পাহাড়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয় তবে ভূমি সমস্যাটি এখনো সমাধান হয়নি।

আপনার মতামত লিখুন

চ্যানেল সিএইচটি

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬


১৯০০ সালের হিল ট্র্যাক্টস বিধি যেভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের ভূমির অধিকার খর্ব করেছে।

প্রকাশের তারিখ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

মূল টপিক্সে যাওয়ার আগে জেনে নিই, হিল ট্র্যাক্টস রেজুলেশন ১৯০০ বলতে কি বোঝায়? "হিল ট্র্যাক্টস রেগুলেশন ১৯০০" হলো এমন একটি আইন, যা বৃটিশ কর্তৃক ১৯০০ সালে প্রণীত হয়েছিল। মূলত বৃটিশ সরকার যখন ভারতবর্ষ (বর্তমান ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ) শাসন করছিল তখন পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা করে প্রশাসন কার্যের সুবিধার্থে একটি বিশেষ বিশেষ আইন বা রেগুলেশন জারি করে। এর নাম ছিল "হিল ট্র্যাক্স রেজুলেশন ১৯০০"।

এবার আসুন জেনে নি, পার্বত্য চট্টগ্রামে বৃটিশ কতৃক প্রণীত এই আইনের মূল বৈশিষ্ট্য গুলো কি। প্রশাসনিক কাঠামো, Forest ও Resource Control, জমি ও বসতি আইন,আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থা,বহিরাগত প্রবেশ সীমাবদ্ধতা,সাধারণ জনগণের অধিকার সীমিতকরণ। মূলত এই ৬টি বৈশিষ্ঠের উপর ভিত্তি করেই পার্বত্য চট্টগ্রামকে বিচ্ছিন্ন অঞ্চল হিসেবে শাষনকার্য পরিচালনার জন বৃটিশরা এই আইন প্রণীত করে।

বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি ও বাঙালি উভয় জনগণ এই আইনের বিরোধীতা কেনো করছে? এর মূল কারণ হচ্ছে এই আইন বর্তমান বাংলাদেশে সংবিধান বিরোধী, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির সম্মুখীন। কারণ গুলো হচ্ছে এই আইনে বলা হয়েছে- 'উপজাতীয়দের জন্য আলাদা রাজা/চিফ ও সার্কেল চিফদের মাধ্যমে শাসনব্যবস্থা'। একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে আমাদের একটি সংবিধান আছে, একজন রাষ্ট্রপতি আছে, একজন প্রধানমন্ত্রী আছে, প্রতিটি জেলায় সরকারের রিপ্রেজেনটেটিভ একজন জেলা প্রসাশন আছে এবং একজন সংসদ সদস্য আছে। এর বাহিরে গিয়ে GenZ এর এই যুগে 'রাজা' নামক ১৯০০ সালের প্রথা এখনো চালু থাকবে এটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। শাষন করার জন্য উপরে উল্লেখিত সরকারি রিপ্রেজেনটেটিভ কিংবা প্রধানমন্ত্রী আছে। যিনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। তবুও কেনো পার্বত্য চট্টগ্রামে আলাদা এক রাজার হাতে প্রসাশনিক ব্যবস্থা,ভূমি মালিকানা ব্যবস্থা থাকবে? 

ভূমির মালিকানা ব্যবস্থা রাজাদের হাতে থাকার ফলে সংবিধান লংঘন তো হয়েছেই সেই সাথে আরোও একটি বড় সমস্যা যেটি হয়েছে তা হলো 'বাঙালিরা নিজ দেশে পরবাসী ও অধিকার হারা হয়েছে'। বৃটিশ প্রণীত হিল ট্র্যাক্টস রেগুলেশন ১৯০০ সালের আইন অনুযায়ি ৩ পার্বত্য জেলায় ৩টি সার্কেল। সার্কেল প্রধানদের বলা হয় 'রাজা'। তাহলে রাজা আছেন ৩ জন। খাগড়াছড়ির সার্কেলের নাম মং সার্কেল, রাঙামাটি সার্কেলের নাম চাকমা সার্কেল এবং বান্দরবান সার্কেলের নাম বোমাং সার্কেল। ৩ সার্কেল প্রধান,অর্থ্যাৎ ৩ জেলার রাজা'ই হচ্ছেন উপজাতি।

এবার মূল টপিক্সে আসা যাক। ১৯০০ সালের হিল ট্র্যাক্টস ম্যানুয়েল ৩৪ নং বিধির (১১) ও (১২) উপবিধি মতে, যে ব্যক্তি সরাসরি সরকারের কাছ থেকে জমি বন্দোবস্ত পেয়েছে (কোনো মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে নয়), তার সেই জমির উপর একটা "স্থায়ী ও উত্তরাধিকারযোগ্য" অধিকার থাকবে। মানে সে নিজে যতদিন খুশি ভোগ করতে পারবে, আর মারা গেলে তার ছেলেমেয়েরাও সেই অধিকার পাবে। কিন্তু এই অধিকারটা "শর্তসাপেক্ষে"। শর্তটা হলো পরের বিধিতে (১২) বলা আছে। সেই শর্তটাই হলো ডেপুটি কমিশনার চাইলে যেকোনো সময় সেই জমির মালিককে উচ্ছেদ করতে পারবেন, বা জমিটা ফিরিয়ে নিতে পারবেন। 

তাহলে বাস্তবে এর মানে দাঁড়ায়: এটা প্রকৃত মালিকানা নয়। যেমন আপনি একটা জমি কিনে পুরোপুরি নিজের নামে রেজিস্ট্রি করলে যা হয়। বরং এটা একধরনের স্থায়ী প্রজাস্বত্ব আপনি দখলে রাখতে ও ব্যবহার করতে পারবেন, উত্তরাধিকারসূত্রে সন্তানদের দিতে পারবেন, কিন্তু জমির উপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ থেকে যায় সরকার কিংবা ডিসির হাতে। সরকার কিংবা ডেপুটি কমিশনার ইচ্ছা করলে যেকোনো সময় সেই জমি থেকে উচ্ছেদ করতে বা জমি ফিরিয়ে নিতে পারেন। এটাই মূলত সেই ধারণাটার আইনি ভিত্তি যে "ব্যবহার করা যাবে, কিন্তু প্রকৃত মালিক হওয়া যাবে না" কারণ চূড়ান্ত মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ থেকে যাচ্ছে রাষ্ট্রের হাতে, ব্যক্তির হাতে নয়।

পরবর্তীতে ১৯৫০ সালে "রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০" The State Acquisition and Tenancy Act, 1950 পাস করে বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ব বাংলা) জমিদারি ও মধ্যস্বত্বাধিকার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে দেয়। বর্তমানে আমাদের দেশে জমি যে কিনে সেই জমির প্রকৃত মালিক হয়। কিন্ত ৩ পার্বত্য জেলা চলছে সেই ১৯০০ সালের ম্যানুয়েলের মাধ্যমে৷ সাধারণ উপজাতিরা আজও বুঝতে পারেনি এই ম্যানুয়েল তাদের অধিকার খর্ব করেছে এবং সার্কেল চীফদের 'রাজা' উপাধি দিয়ে মূলা ঝুলিয়ে রাখার মতন সান্তনা দিয়েছে ইংরেজরা। 

সার্কেল প্রধানদের আরোও যেভাবে খুশি রাখা হয়ঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধিমালা ১৯০০ কার্যকর করার মাধ্যমে তিন পার্বত্য জেলার সার্কেল প্রধানদের রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। সার্কেল চীফকে রাজস্ব আদায়ের এবং নিজ নিজ এলাকার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। সার্কেলগুলো নিয়ে জেলাকে তিনটি মহকুমায় (রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও রামগড়) বিভক্ত করা হয় এবং মহকুমা প্রশাসক নিয়োগ দেয়া হয়। তাদেরকে সার্কেল চীফের কার্যাবলী তদারকী ও লিঁয়াজো করার দায়িত্ব দেয়া হয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধিমালাকে একটা অন্যতম দলিল হিসেবে পাহাড়িরা গণ্য করে থাকে, যদিও ওই বিধিমালার বেশির ভাগ ধারা ছিল উপজাতীয়দের জন্য অবমাননাকর। বিধি অনুসারে গোটা পার্বত্য জেলার বিধাতা বনে যান জেলা প্রশাসক বা ডেপুটি কমিশনার। যিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে থেকে ইংরেজ কতৃক নিযুক্ত হবেন। সেখানে পার্বত্য অঞ্চলে জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া বাইরের কেউ সেখানে যেতে বা বসতি স্থাপন করতে পারবে না। কিন্তু কেন নিষিদ্ধ ছিল, তা উপজাতি অ্যাক্টিভিস্ট কিংবা সুশীলরা উল্ল্যেখ করেন না। এই বাক্যটি উপজাতি নেতারা খুব সচেতনভাবে এড়িয়ে যান।

এই বিধিমালায় পার্বত্য চট্টগ্রামকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করে ওই এলাকার বাসিন্দাদের নাগরিক অধিকার বঞ্চিত আশ্রিত জনগোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এছাড়া তাদের ভূমি অধিকার ছিল না। উপজাতীয় কারবারিদের শুধু যাযাবর জুম চাষের পাঁচসালা বিলি ব্যবস্থা ও বন্য প্রাণী রক্ষণাবেক্ষণের ভার দেয়া হয়। বাঙালিদের দেখাদেখি খুবই সামান্য সংখ্যক উপজাতীয় হালচাষ রপ্ত করে। বিধিমালায় স্পষ্ট করে লেখা ছিল উপজাতীয়রা পঁচিশ বিঘা জমি ব্যাবহার করতে পারবে, কিন্তু জমির মালিক হতে পারবে না। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ১৭৯৩ সালে ব্রিটিশ প্রতিনিধি লর্ড কর্ণওয়ালিশ কর্তৃক ভারত উপমহাদেশে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা কার্যকরী থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন উপজাতীয় প্রধানকে জমিদারি স্বত্ব দেয়া হয়নি। শুধু সার্কেল চীফ বা রাজা খেতাব দিয়ে তাদের খুশি রাখা হয়েছিল। সার্কেল চীফ বা রাজার ক্ষমতা ছিল কেবল খাজনা আদায় করার। তখনকার সময় এর আর্থিক মূল্য থাকলেও এখন সেই মূল্য নামে মাত্র। নামে মাত্র মূল্যের সেই খাজনা এখনও রাজপরিবার আদায় করেন।

পার্বত্য এলাকা ‘নন-রেগুলেটেড এরিয়া’ বা ‘অনিয়ন্ত্রিত’ এলাকা হিসেবে ঘোষিত হয়, যেখানে জেলা প্রশাসকের অনুমতি ব্যাতিত কেউ প্রবেশ করতে কিংবা বসতি স্থাপন করতে পারবে না। উপজাতীয়রা পঁচিশ বিঘা জমি ব্যাবহার করতে পারবে, কিন্তু মালিক হতে পারবে না। বিচারালয়ে কোন উকিল থাকবে না। সার্কেল চীফ (রাজা), হেডম্যান ও কারবারিরা থাকবে। দরকার হলে উপজাতীয়রা বিনা পারিশ্রমিকে সরকারি কর্মকর্তাদের চাহিদা মোতাবেক কাজ করে দিতে বাধ্য থাকবে। সার্কেল চীফ (রাজা), হেডম্যান এমনকি কারবারিরাও তাঁর অধীনস্থ উপজাতীয়দের খাটাতে পারবে কোন পারিশ্রমিক না দিয়েই। এই বিধিগুলো সাধারন পাহাড়িদের উপকার করবে, নাকি এলিটদের?

১৯০০ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের দেয়া হয় হাট-বাজারের দায়িত্ব। এ জন্যই পার্বত্য চট্টগ্রামে যে ক্ষুদ্র পরিমান উন্নয়ন হয়েছে, দেশের অন্যান্য অংশের সাথে যেই ক্ষুদ্র হলেও তাল মিলিয়ে চলতে ফিরতে পারছে এই অঞ্চল, তার প্রায় সিংহভাগ কৃত্তিত্ব বাঙালিদের। আইনী দিক বিবেচনায় বলতে হয়, ১৯২০ সালে স্বয়ং ব্রিটিশ সরকার উপজাতীয় কুকীদের নিয়ন্ত্রনে এনে পার্বত্য চট্টগ্রামকে এক্সক্লুসিভ এরিয়া ঘোষণা দিয়ে সেখানে বহিরাগতদের আগমন প্রক্রিয়া সহজ করেছিল। এই বিধিমালা যারা প্রনয়ন করেছিল তারাই এই বিধিমালার মধ্যে যেই বিশেষ বিধিটির প্রতি বর্তমানে পাহাড়ি নেতাদের প্রচন্ড আগ্রহ তা বাতিল করেছিল। এমনকি পাকিস্তান সরকার সাধারন পাহাড়িদের স্বার্থে এই বিধিমালাই একবার বাতিল করেছিল, পরে বিভক্তি আনয়নের জন্য এটি আবার চালু করে। (সূত্রঃ শরবিন্দু চাকমা, মুক্তিযুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রাম)।

পার্বত্য শান্তি চুক্তির পর রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন ১৯৮৯ (১৯৮৯ সনের ১৯, ২০ ও ২১নং আইন) সংশোধিত রাঙ্গামাটি/খাগড়াছড়ি/বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৯৮ (১৯৯৮ সনের ৯, ১০ ও ১১নং আইন) কার্যকর হওয়ার পর ৬৪ ধারায় (শান্তি চুক্তির খ খন্ডের ২৬ ধারা) পার্বত্য জেলা পরিষদের নিকট ভূমি সংক্রান্ত যে কোন ক্রয়-বিক্রয়, পরিবর্তন বা অধিগ্রহণের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশান ১৯০০ কার্যকর থাকায় ভূমি সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। ২রা ডিসেম্বর ১৯৯৭ সালে পার্বত্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে পাহাড়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয় তবে ভূমি সমস্যাটি এখনো সমাধান হয়নি।


চ্যানেল সিএইচটি

সম্পাদক : এইচ এ আব্দুর রউফ, উপদেষ্টা : কামাল পারভেজ
কপিরাইট © ২০২৬ চ্যানেল সিএইচটি । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত