২০২১ সালে সালের ১৭ই বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলার ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের খ্রিস্টান ধর্ম থেকে মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করা শহীদ ওমর ফারুক ত্রিপুরাকে গুলি করে হত্যা করে পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। ওমর ফারুক পূর্বে পিতৃধর্ম খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারী ছিলেন, তার নাম ছিলো বেরণ চন্দ্র ত্রিপুরা। তার পিতার নাম ছিলো তয়ারাম ত্রিপুরা। ২০১৪ সালে বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলায় গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং নিজের নাম পরিবর্তন করে মুহাম্মাদ ওমর ফারুক ত্রিপুরা রাখেন।
তার সাথে পরিবারের সবাই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন, পরিবারের সবাই থানচি উপজেলাতেই বসবাস শুরু করে। তবে মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে রোয়াংছড়ি নিজ এলাকায় ফিরে আসেন। তিনি রোয়াংছড়ি বাজারে রোয়াংছড়ি জামে মসজিদে নামাজ পরতেন, তবে তিনি নিজ বাড়ির নিকটে(রোয়াংছড়ি) শ্বশুরের কাছ থেকে পাওয়া জায়গায় তুলাছড়ি ত্রিপুরা মসজিদ নামে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন।
পাহাড়ে নিজ এলাকায় মসজিদ নির্মাণের ফলে সন্ত্রাসী সংগঠন জেএসএস বেশ কয়েকবার হুমকি এবং ইসলাম ধর্ম প্রচারে বিরত থাকতে বলেছিল তাকে।
তবে সকল হুমকি ধমকির তোয়াক্কা না করে ওমর ফারুক ইসলাম ধর্ম প্রচার চালিয়ে যান৷ সে নিয়মিত মসজিদে আযান দিত এবং সেই মসজিদের ইমামতি করত। তার হাতে ঐ এলাকার বেশ কয়েকটি খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ ধর্মের পরিবার ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং ননওমুসলিম হিসেবে তারাও নিয়মিত নামায দোয়া পড়তে থাকে।
পরবর্তীতে ২০২১ সালের ১৮ জুন(শুক্রুবার) এশারের নামাযের শেষে রাত ৮ টায় সন্ত লারমা পালিত সন্ত্রাসী সংগঠন জেএসএস এর ৪ জন সন্ত্রাসী তার রুমে ডুকে যায়। তাকে মারধর করে টেনে হিছড়ে বাড়ির উঠানে নিয়ে আসে। এসময় সন্ত্রাসীরা তাকে ধর্ম ত্যাগ করতে শাসাচ্ছিল এবং মসজিদ বানানোতে ভর্ৎসনা করছিলো।
এর এক পর্যায়ে তার মাথায় ও বুকে ৩টি গুলি করে সন্ত্রাসীরা। পরে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন 'শহীদ ওমর ফারুক ত্রিপুরা'। এই ঘটনায় ২০ জুন ওমর ফারুকের স্ত্রী নওমুসলিম রাবেয়া বেগম বাদি হয়ে অজ্ঞাতনামা পাহাড়ি উগ্রবাদী সংগঠনের অজ্ঞাত পাঁচজনকে আসামি করে থানায় মামলা করেন। আদালত থেকে ওয়ারেন্ট ইস্যু হওয়ার পর এই ঘটনায় ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ২ জনকে আটক করে রোয়াংছড়ি থানা পুলিশ। তারা হলেন ডানিয়েল ত্রিপুরা (৪০): রোয়াংছড়ি ইউনিয়নের তুলাছড়ি পাড়ার বাসিন্দা দেবেন্দ্র ত্রিপুরার ছেলে এবং জমালা ত্রিপুরা ওরফে জমা ত্রিপুরা (৩৫), একই এলাকার ত্রিপলা ত্রিপুরার ছেলে। তারা উভয় সন্ত লারমা নের্তৃত্বাধীন পাহাড়ি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী পিসিজেএসএস ওর সদস্য।
ওমর ফারুক ত্রিপুরা হত্যায় ফুঁসে উঠেছিল পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি মুসলিমরা সহ সারা বাংলাদেশের ধর্মপ্রিয় জনতা। প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠেছিল পার্বত্য জনপথ। অন্যদিকে পাহাড়ি সন্ত্রাসী সংগঠন জেএসএস, ইউপিফিএফ, প্রসীত খীসা, সন্ত লারমা ও দেবাশীষ রায়'রা অট্টহাসিতে মেতে উঠেছিল। এই হত্যাকান্ডের মাস্টারমাইন্ড সন্ত লারমা ৩০ বছর ধরে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদ কুক্ষিগত করে রেখেছেন। এটি রাষ্ট্রের জন্য যেমন লজ্জা, তেমনই জাতির জন্যেও লজ্জা। বিদেশী শক্তির চাপ এবং কমিউনিস্টদের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে পাহাড়ের এসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছে না রাষ্ট্র। উল্টো নানান সুবিধা পাচ্ছে এই উপজাতীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নেতারা। পাহাড়ে বাঙালি,ম্রো,বম জনগোষ্ঠীদের কোনঠাসা করে রেখেছে চাকমা,মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর কিছু সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করা ৫৮% বাঙালি জনগোষ্ঠীর উপর বারবার গণহত্যা চালিয়েছে জেএসএস ও ইউপিডএফ এর মতন পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা।
বাংলাদেশ সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদের ১ নম্বর ধারার (ক), (খ) ও (গ) উপধারা প্রতিটি নাগরিকের ধর্মাবলম্বন, ধর্মচর্চা, ধর্মানুশীলন, ধর্মপ্রচার এবং ধর্মীয় উপাসনালয় স্থাপনের অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে অকাট্য ও চূড়ান্ত নিশ্চয়তা দিয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ আইনের এই সুস্পষ্ট ঘোষণা অনুযায়ী, যেকোনো ধর্মপ্রচার বা স্বেচ্ছায় ধর্ম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আইনত কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির সুযোগ নেই। তবে এই সাংবিধানিক স্বাধীনতার সমান্তরালে এটিও সমান সত্য যে, মানুষের দারিদ্র্য ও অনগ্রসরতার সুযোগ নিয়ে কোনো ধরনের প্রলোভন বা জোরপূর্বক ধর্মান্তরণ একটি মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধ, যা কঠোরভাবে দণ্ডনীয়। একটি প্রগতিশীল ও অখণ্ড রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অগ্রগতি বজায় রাখতে হলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং এটি একটি অপরিহার্য পূর্বশর্ত।
পার্বত্য চট্টগ্রামে শহীদ ওমর ফারুক ত্রিপুরা হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও জেএসএস (JSS) এবং ইউপিডিএফ (UPDF)-এর মতো সশস্ত্র পাহাড়ি সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারা বর্তমান সরকারের একটি চরম প্রশাসনিক ও কৌশলগত ব্যর্থতা। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভেতরে বছরের পর বছর ধরে সমান্তরাল প্রশাসন চালানো, চাঁদাবাজি ও প্রকাশ্য দিবালোকে ধর্মের কারণে বা আদর্শিক কারণে নাগরিককে হত্যার পরও যদি রাষ্ট্র নীরব বা আপসকামী ভূমিকা পালন করে, তবে তা সরকারের সদিচ্ছা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতাকেই বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
পাহাড়ি এই উগ্রবাদী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য অঞ্চলে একচ্ছত্র নৈরাজ্য কায়েম করে রেখেছে। সেখানে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে যারা মূলধারার সমাজ বা রাষ্ট্রের পক্ষে কথা বলেন, কিংবা স্বেচ্ছায় ধর্ম পরিবর্তন করে ওমর ফারুকের মতো সাধারণ জীবনযাপন করতে চান, তাদের নিরাপত্তা দিতে রাষ্ট্র সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। ওমর ফারুক ত্রিপুরাকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যার ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ ছিল না, এটি ছিল রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের গালে এক প্রচণ্ড চপেটাঘাত। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পরও রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে যে ধরনের কঠোর ও দৃশ্যমান চিরুনি অভিযান চালানো উচিত ছিল, তা রহস্যজনকভাবে অনুপস্থিত।
রাষ্ট্রের এই ঢিলেঢালা এবং আপসকামী মনোভাবের কারণেই এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো আজ ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। তারা পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিজেদের আলাদা আইন ও বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যা স্পষ্টতই রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নাকের ডগায় কীভাবে এই নিষিদ্ধ ও সশস্ত্র গ্রুপগুলো ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সাধারণ নাগরিকদের জিম্মি করে রাখছে এবং একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তার জবাব রাষ্ট্রকে দিতে হবে।
আজ থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ’ বছর আগে ইসলামের প্রাথমিক যুগে রাসূলুল্লাহ সা:-এর সময় হজরত খাব্বাব ইবনুল আরাত নামের একজন সাহাবি ছিলেন। নওমুসলিম হওয়ার কারণে তিনি অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করেছেন। তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হতো এবং কখনো কখনো মারতে মারতে বেহুঁশ করে ফেলা হতো। কিন্তু তিনি কিছুতেই আত্মসমর্পণ করেননি। বরং তিনি মক্কার ঘরে ঘরে গিয়ে ইসলাম প্রচার করতেন এবং নওমুসলিমদের দ্বীনের শিক্ষা দিতেন। পরে তিনি রাসূল সা:-এর নির্দেশে মদিনায় হিজরত করেন এবং ইসলামের সব যুদ্ধেই অংশগ্রহণ করেন। তিনি ৭২ বছর বয়সে অসুস্থ হয়ে ইন্তেকাল করেন। আমাদের দেশেও এমন একজন বীর মুজাহিদের আবির্ভাব ঘটেছিল নীরবে। তার নাম ওমর ফারুক ত্রিপুরা। যাকে আজীবন মনে রাখবে এই বাংলাদেশ।
লেখক: তানভির হোসেন ইমন

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ জুন ২০২৬
২০২১ সালে সালের ১৭ই বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলার ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের খ্রিস্টান ধর্ম থেকে মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করা শহীদ ওমর ফারুক ত্রিপুরাকে গুলি করে হত্যা করে পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসী সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)। ওমর ফারুক পূর্বে পিতৃধর্ম খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারী ছিলেন, তার নাম ছিলো বেরণ চন্দ্র ত্রিপুরা। তার পিতার নাম ছিলো তয়ারাম ত্রিপুরা। ২০১৪ সালে বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলায় গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং নিজের নাম পরিবর্তন করে মুহাম্মাদ ওমর ফারুক ত্রিপুরা রাখেন।
তার সাথে পরিবারের সবাই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন, পরিবারের সবাই থানচি উপজেলাতেই বসবাস শুরু করে। তবে মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে রোয়াংছড়ি নিজ এলাকায় ফিরে আসেন। তিনি রোয়াংছড়ি বাজারে রোয়াংছড়ি জামে মসজিদে নামাজ পরতেন, তবে তিনি নিজ বাড়ির নিকটে(রোয়াংছড়ি) শ্বশুরের কাছ থেকে পাওয়া জায়গায় তুলাছড়ি ত্রিপুরা মসজিদ নামে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন।
পাহাড়ে নিজ এলাকায় মসজিদ নির্মাণের ফলে সন্ত্রাসী সংগঠন জেএসএস বেশ কয়েকবার হুমকি এবং ইসলাম ধর্ম প্রচারে বিরত থাকতে বলেছিল তাকে।
তবে সকল হুমকি ধমকির তোয়াক্কা না করে ওমর ফারুক ইসলাম ধর্ম প্রচার চালিয়ে যান৷ সে নিয়মিত মসজিদে আযান দিত এবং সেই মসজিদের ইমামতি করত। তার হাতে ঐ এলাকার বেশ কয়েকটি খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ ধর্মের পরিবার ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং ননওমুসলিম হিসেবে তারাও নিয়মিত নামায দোয়া পড়তে থাকে।
পরবর্তীতে ২০২১ সালের ১৮ জুন(শুক্রুবার) এশারের নামাযের শেষে রাত ৮ টায় সন্ত লারমা পালিত সন্ত্রাসী সংগঠন জেএসএস এর ৪ জন সন্ত্রাসী তার রুমে ডুকে যায়। তাকে মারধর করে টেনে হিছড়ে বাড়ির উঠানে নিয়ে আসে। এসময় সন্ত্রাসীরা তাকে ধর্ম ত্যাগ করতে শাসাচ্ছিল এবং মসজিদ বানানোতে ভর্ৎসনা করছিলো।
এর এক পর্যায়ে তার মাথায় ও বুকে ৩টি গুলি করে সন্ত্রাসীরা। পরে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন 'শহীদ ওমর ফারুক ত্রিপুরা'। এই ঘটনায় ২০ জুন ওমর ফারুকের স্ত্রী নওমুসলিম রাবেয়া বেগম বাদি হয়ে অজ্ঞাতনামা পাহাড়ি উগ্রবাদী সংগঠনের অজ্ঞাত পাঁচজনকে আসামি করে থানায় মামলা করেন। আদালত থেকে ওয়ারেন্ট ইস্যু হওয়ার পর এই ঘটনায় ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ২ জনকে আটক করে রোয়াংছড়ি থানা পুলিশ। তারা হলেন ডানিয়েল ত্রিপুরা (৪০): রোয়াংছড়ি ইউনিয়নের তুলাছড়ি পাড়ার বাসিন্দা দেবেন্দ্র ত্রিপুরার ছেলে এবং জমালা ত্রিপুরা ওরফে জমা ত্রিপুরা (৩৫), একই এলাকার ত্রিপলা ত্রিপুরার ছেলে। তারা উভয় সন্ত লারমা নের্তৃত্বাধীন পাহাড়ি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী পিসিজেএসএস ওর সদস্য।
ওমর ফারুক ত্রিপুরা হত্যায় ফুঁসে উঠেছিল পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালি মুসলিমরা সহ সারা বাংলাদেশের ধর্মপ্রিয় জনতা। প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠেছিল পার্বত্য জনপথ। অন্যদিকে পাহাড়ি সন্ত্রাসী সংগঠন জেএসএস, ইউপিফিএফ, প্রসীত খীসা, সন্ত লারমা ও দেবাশীষ রায়'রা অট্টহাসিতে মেতে উঠেছিল। এই হত্যাকান্ডের মাস্টারমাইন্ড সন্ত লারমা ৩০ বছর ধরে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদ কুক্ষিগত করে রেখেছেন। এটি রাষ্ট্রের জন্য যেমন লজ্জা, তেমনই জাতির জন্যেও লজ্জা। বিদেশী শক্তির চাপ এবং কমিউনিস্টদের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে পাহাড়ের এসব সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারছে না রাষ্ট্র। উল্টো নানান সুবিধা পাচ্ছে এই উপজাতীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নেতারা। পাহাড়ে বাঙালি,ম্রো,বম জনগোষ্ঠীদের কোনঠাসা করে রেখেছে চাকমা,মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর কিছু সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করা ৫৮% বাঙালি জনগোষ্ঠীর উপর বারবার গণহত্যা চালিয়েছে জেএসএস ও ইউপিডএফ এর মতন পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা।
বাংলাদেশ সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদের ১ নম্বর ধারার (ক), (খ) ও (গ) উপধারা প্রতিটি নাগরিকের ধর্মাবলম্বন, ধর্মচর্চা, ধর্মানুশীলন, ধর্মপ্রচার এবং ধর্মীয় উপাসনালয় স্থাপনের অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে অকাট্য ও চূড়ান্ত নিশ্চয়তা দিয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ আইনের এই সুস্পষ্ট ঘোষণা অনুযায়ী, যেকোনো ধর্মপ্রচার বা স্বেচ্ছায় ধর্ম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আইনত কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির সুযোগ নেই। তবে এই সাংবিধানিক স্বাধীনতার সমান্তরালে এটিও সমান সত্য যে, মানুষের দারিদ্র্য ও অনগ্রসরতার সুযোগ নিয়ে কোনো ধরনের প্রলোভন বা জোরপূর্বক ধর্মান্তরণ একটি মারাত্মক ফৌজদারি অপরাধ, যা কঠোরভাবে দণ্ডনীয়। একটি প্রগতিশীল ও অখণ্ড রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অগ্রগতি বজায় রাখতে হলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করা কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং এটি একটি অপরিহার্য পূর্বশর্ত।
পার্বত্য চট্টগ্রামে শহীদ ওমর ফারুক ত্রিপুরা হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও জেএসএস (JSS) এবং ইউপিডিএফ (UPDF)-এর মতো সশস্ত্র পাহাড়ি সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারা বর্তমান সরকারের একটি চরম প্রশাসনিক ও কৌশলগত ব্যর্থতা। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের ভেতরে বছরের পর বছর ধরে সমান্তরাল প্রশাসন চালানো, চাঁদাবাজি ও প্রকাশ্য দিবালোকে ধর্মের কারণে বা আদর্শিক কারণে নাগরিককে হত্যার পরও যদি রাষ্ট্র নীরব বা আপসকামী ভূমিকা পালন করে, তবে তা সরকারের সদিচ্ছা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতাকেই বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
পাহাড়ি এই উগ্রবাদী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য অঞ্চলে একচ্ছত্র নৈরাজ্য কায়েম করে রেখেছে। সেখানে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে যারা মূলধারার সমাজ বা রাষ্ট্রের পক্ষে কথা বলেন, কিংবা স্বেচ্ছায় ধর্ম পরিবর্তন করে ওমর ফারুকের মতো সাধারণ জীবনযাপন করতে চান, তাদের নিরাপত্তা দিতে রাষ্ট্র সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। ওমর ফারুক ত্রিপুরাকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যার ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ ছিল না, এটি ছিল রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের গালে এক প্রচণ্ড চপেটাঘাত। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পরও রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে যে ধরনের কঠোর ও দৃশ্যমান চিরুনি অভিযান চালানো উচিত ছিল, তা রহস্যজনকভাবে অনুপস্থিত।
রাষ্ট্রের এই ঢিলেঢালা এবং আপসকামী মনোভাবের কারণেই এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো আজ ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। তারা পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিজেদের আলাদা আইন ও বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, যা স্পষ্টতই রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নাকের ডগায় কীভাবে এই নিষিদ্ধ ও সশস্ত্র গ্রুপগুলো ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সাধারণ নাগরিকদের জিম্মি করে রাখছে এবং একের পর এক হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তার জবাব রাষ্ট্রকে দিতে হবে।
আজ থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ’ বছর আগে ইসলামের প্রাথমিক যুগে রাসূলুল্লাহ সা:-এর সময় হজরত খাব্বাব ইবনুল আরাত নামের একজন সাহাবি ছিলেন। নওমুসলিম হওয়ার কারণে তিনি অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করেছেন। তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হতো এবং কখনো কখনো মারতে মারতে বেহুঁশ করে ফেলা হতো। কিন্তু তিনি কিছুতেই আত্মসমর্পণ করেননি। বরং তিনি মক্কার ঘরে ঘরে গিয়ে ইসলাম প্রচার করতেন এবং নওমুসলিমদের দ্বীনের শিক্ষা দিতেন। পরে তিনি রাসূল সা:-এর নির্দেশে মদিনায় হিজরত করেন এবং ইসলামের সব যুদ্ধেই অংশগ্রহণ করেন। তিনি ৭২ বছর বয়সে অসুস্থ হয়ে ইন্তেকাল করেন। আমাদের দেশেও এমন একজন বীর মুজাহিদের আবির্ভাব ঘটেছিল নীরবে। তার নাম ওমর ফারুক ত্রিপুরা। যাকে আজীবন মনে রাখবে এই বাংলাদেশ।
লেখক: তানভির হোসেন ইমন

আপনার মতামত লিখুন