সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ঢাকা
চ্যানেল সিএইচটি

সাজেকে পর্যটন ব্যবসাসীদের স্বার্থান্বেষী আচরণ ও নিরাপত্তার টানাপোড়েন: কাদের স্বার্থে ঝুঁকিতে পাহাড়ি অর্থনীতি?



সাজেকে পর্যটন ব্যবসাসীদের স্বার্থান্বেষী আচরণ ও নিরাপত্তার টানাপোড়েন: কাদের স্বার্থে ঝুঁকিতে পাহাড়ি অর্থনীতি?

সাজেক ভ্যালিতে আগমনকারী পর্যটকদের শান্তি, শৃঙ্খলা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে স্থানীয় হোটেল, পরিবহন ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে প্রতিনিয়ত বড় ধরনের প্রশ্ন উঠছে। বাস্তবে দেখা যায়, পর্যটকদের নিরাপত্তা ও পাহাড়ের সার্বিক স্থিতিশীলতার চেয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে নিজস্ব বাণিজ্যিক স্বার্থই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের স্পর্শকাতর ও জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে তোয়াক্কা না করে কেবল নিজেদের আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে সাজেকের পর্যটন ব্যবসায়ীরা হাজার হাজার পর্যটককে এনে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিতেও দ্বিধাবোধ করে না। উপরন্তু, পাহাড়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কিংবা নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনী যেসব ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, সেখানে এসব ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতা করতে দেখা যায় না।

সাজেক অঞ্চলের পর্যটন খাতের মূল সংকট ও অস্থিতিশীলতার প্রধান কারণ হলো আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন ইউপিডিএফ ও জেএসএস এর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নিয়মিত চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। পর্যটকদের সার্বিক সুরক্ষা ও জীবনের নিরাপত্তা অগ্রাধিকার দিয়ে যখন প্রশাসন বাধ্য হয়ে সাজেক পর্যটন কেন্দ্র সাময়িক বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন এসব স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ী মহল ঘটনার মূল কারণ এড়িয়ে প্রশাসনের সিদ্ধান্তেরই বিরোধিতা শুরু করে। সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সহিংসতার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ না জানিয়ে, মানববন্ধনে অংশ না নিয়ে কিংবা স্মারকলিপি না দিয়ে, উল্টো তারা পর্যটন কেন্দ্র দ্রুত খুলে দেওয়ার দাবিতে প্রশাসন ও সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং নিরাপত্তা বাহিনী, প্রশাসন ও গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার চালাতে শুরু করে।

সাজেকের স্বার্থান্বেষী পর্যটক ব্যবসায়ীদের এমন একপেশে ও অসংগতিপূর্ণ আচরণ এবং সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মুখে নিরবতা বজায় রাখা স্পষ্ট করে যে, তাদের সাথে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর এক ধরনের অশুভ আঁতাত রয়েছে। নিজেদের ব্যবসায়িক সুবিধা বজায় রাখতে এসব ব্যবসায়ীরা সশস্ত্র সংগঠনগুলোকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দিয়ে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখে। আর এই চাঁদার বিপুল অঙ্কের টাকা তারা তুলে নেয় সাজেকে ঘুরতে আসা সাধারণ পর্যটকদের পকেট থেকে, অতিরিক্ত হোটেল ভাড়া, চড়া পরিবহন খরচ ও অন্যান্য সেবা খাতের বাড়তি দাম আদায়ের মাধ্যমে। ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ার পাশাপাশি সাজেকে যাওয়া পর্যটকদের প্রতিনিয়ত আর্থিক শোষণের শিকারও হতে হচ্ছে।

পাহাড়ের যেকোনো জটিল বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে দিনশেষে তার সমস্ত ঝুঁকি, দায়িত্ব ও দায়ভার সামলাতে হয় দেশের নিরাপত্তা বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকদের। সংঘাতময় মুহূর্তে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের আইনশৃঙ্খলা ও শান্তি অক্ষুণ্ণ রাখার কাজ তারাই করে যান। কিন্তু সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার সমস্ত চাপ প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ওপর পড়লেও, দিনশেষে সব ধরনের আর্থিক ফায়দা ও সুযোগ-সুবিধা লুটে নেয় সাজেকের এই স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ী শ্রেণি, যারা সংকটের সময় নিজেদের কোনো দায়িত্ব পালন করে না।

বর্তমানে সাজেকের সিংহভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করছেন পাহাড়ের বাহির থেকে আসা স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ীরা। তারা স্থানীয় সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করলেও সেই উপার্জিত অর্থ পার্বত্য অঞ্চলের বাইরে পাঠিয়ে দেন, যার ফলে পাহাড়ের স্থানীয় অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত কোনো পরিবর্তন বা টেকসই উন্নয়ন আসছে না। এই স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর একচেটিয়া প্রভাব কমিয়ে সাজেকের পর্যটন ও ব্যবসার দায়িত্ব পাহাড়ের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। স্থানীয় তরুণ ও সাধারণ মানুষকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ দিলে পাহাড়ের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং স্থানীয় মানুষ সরাসরি পর্যটন খাতের সুফল ভোগ করতে পারবে।

আপনার মতামত লিখুন

চ্যানেল সিএইচটি

সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬


সাজেকে পর্যটন ব্যবসাসীদের স্বার্থান্বেষী আচরণ ও নিরাপত্তার টানাপোড়েন: কাদের স্বার্থে ঝুঁকিতে পাহাড়ি অর্থনীতি?

প্রকাশের তারিখ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

সাজেক ভ্যালিতে আগমনকারী পর্যটকদের শান্তি, শৃঙ্খলা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে স্থানীয় হোটেল, পরিবহন ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে প্রতিনিয়ত বড় ধরনের প্রশ্ন উঠছে। বাস্তবে দেখা যায়, পর্যটকদের নিরাপত্তা ও পাহাড়ের সার্বিক স্থিতিশীলতার চেয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে নিজস্ব বাণিজ্যিক স্বার্থই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের স্পর্শকাতর ও জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে তোয়াক্কা না করে কেবল নিজেদের আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে সাজেকের পর্যটন ব্যবসায়ীরা হাজার হাজার পর্যটককে এনে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিতেও দ্বিধাবোধ করে না। উপরন্তু, পাহাড়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কিংবা নিরাপত্তার স্বার্থে প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনী যেসব ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করে, সেখানে এসব ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতা করতে দেখা যায় না।

সাজেক অঞ্চলের পর্যটন খাতের মূল সংকট ও অস্থিতিশীলতার প্রধান কারণ হলো আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন ইউপিডিএফ ও জেএসএস এর আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে নিয়মিত চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। পর্যটকদের সার্বিক সুরক্ষা ও জীবনের নিরাপত্তা অগ্রাধিকার দিয়ে যখন প্রশাসন বাধ্য হয়ে সাজেক পর্যটন কেন্দ্র সাময়িক বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন এসব স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ী মহল ঘটনার মূল কারণ এড়িয়ে প্রশাসনের সিদ্ধান্তেরই বিরোধিতা শুরু করে। সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সহিংসতার বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ না জানিয়ে, মানববন্ধনে অংশ না নিয়ে কিংবা স্মারকলিপি না দিয়ে, উল্টো তারা পর্যটন কেন্দ্র দ্রুত খুলে দেওয়ার দাবিতে প্রশাসন ও সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং নিরাপত্তা বাহিনী, প্রশাসন ও গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার চালাতে শুরু করে।

সাজেকের স্বার্থান্বেষী পর্যটক ব্যবসায়ীদের এমন একপেশে ও অসংগতিপূর্ণ আচরণ এবং সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মুখে নিরবতা বজায় রাখা স্পষ্ট করে যে, তাদের সাথে আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর এক ধরনের অশুভ আঁতাত রয়েছে। নিজেদের ব্যবসায়িক সুবিধা বজায় রাখতে এসব ব্যবসায়ীরা সশস্ত্র সংগঠনগুলোকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দিয়ে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখে। আর এই চাঁদার বিপুল অঙ্কের টাকা তারা তুলে নেয় সাজেকে ঘুরতে আসা সাধারণ পর্যটকদের পকেট থেকে, অতিরিক্ত হোটেল ভাড়া, চড়া পরিবহন খরচ ও অন্যান্য সেবা খাতের বাড়তি দাম আদায়ের মাধ্যমে। ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ার পাশাপাশি সাজেকে যাওয়া পর্যটকদের প্রতিনিয়ত আর্থিক শোষণের শিকারও হতে হচ্ছে।

পাহাড়ের যেকোনো জটিল বা অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে দিনশেষে তার সমস্ত ঝুঁকি, দায়িত্ব ও দায়ভার সামলাতে হয় দেশের নিরাপত্তা বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকদের। সংঘাতময় মুহূর্তে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ের আইনশৃঙ্খলা ও শান্তি অক্ষুণ্ণ রাখার কাজ তারাই করে যান। কিন্তু সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার সমস্ত চাপ প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ওপর পড়লেও, দিনশেষে সব ধরনের আর্থিক ফায়দা ও সুযোগ-সুবিধা লুটে নেয় সাজেকের এই স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ী শ্রেণি, যারা সংকটের সময় নিজেদের কোনো দায়িত্ব পালন করে না।

বর্তমানে সাজেকের সিংহভাগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করছেন পাহাড়ের বাহির থেকে আসা স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ীরা। তারা স্থানীয় সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করলেও সেই উপার্জিত অর্থ পার্বত্য অঞ্চলের বাইরে পাঠিয়ে দেন, যার ফলে পাহাড়ের স্থানীয় অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত কোনো পরিবর্তন বা টেকসই উন্নয়ন আসছে না। এই স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর একচেটিয়া প্রভাব কমিয়ে সাজেকের পর্যটন ও ব্যবসার দায়িত্ব পাহাড়ের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। স্থানীয় তরুণ ও সাধারণ মানুষকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ দিলে পাহাড়ের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে এবং স্থানীয় মানুষ সরাসরি পর্যটন খাতের সুফল ভোগ করতে পারবে।


চ্যানেল সিএইচটি

সম্পাদক : এইচ এ আব্দুর রউফ, উপদেষ্টা : কামাল পারভেজ
কপিরাইট © ২০২৬ চ্যানেল সিএইচটি । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত