সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ঢাকা
চ্যানেল সিএইচটি

ইউএনপিও অধিবেশনে 'পার্বত্য চুক্তি ও সেনাবাহিনী' নিয়ে জেএসএস এর মিথ্যা রেজুলেশন পাশঃ



ইউএনপিও অধিবেশনে 'পার্বত্য চুক্তি ও সেনাবাহিনী' নিয়ে জেএসএস এর মিথ্যা রেজুলেশন পাশঃ

নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে গত ২৯-৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে আনরিপ্রেজেন্টেড নেশনস অ্যান্ড পিপলস অর্গানাইজেশনের (ইউএনপিও) ২১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত আন্তর্জাতিক সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ২৯ আগস্ট শনিবার, প্রথম দিনের অধিবেশনে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) পক্ষে প্রতিনিধি হিসেবে প্রীতিবিন্দু চাকমা ও ইঞ্জেবি চাকমা অংশগ্রহণ করেন। সভায় প্রীতিবিন্দু চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রামের ওপর একটি বিভ্রান্তিকর রেজুলেশন উপস্থাপন করেন এবং তা সেখানে পাস করিয়ে নেন।

জেএসএস প্রতিনিধিরা আন্তর্জাতিক মঞ্চে যে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন, তা বাস্তবতার সম্পূর্ণ বিপরীত। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে এটি এক গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। জেএসএস সেখানে দাবি করেছে, "পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর ২৯ বছর অতিক্রান্ত হলেও চুক্তির মৌলিক বিষয়সহ চুক্তির দুই-তৃতীয়াংশ ধারা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।" তাদের এই বক্তব্য বস্তুনিষ্ঠ সত্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।


সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৯৭ সালের চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৬৮টি ধারাই বেশিরভাগ বাস্তবায়িত হয়েছে অথবা চূড়ান্ত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। অর্থাৎ শতাংশের হিসাবে চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি ৯০ ভাগের বেশি। চুক্তির শর্তানুসারে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠিত হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ পুনর্গঠিত হয়েছে এবং ১৯৮৯ সালের আইন সংশোধন করে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদকে স্থানীয় শাসন কাঠামোর আওতায় সংহত করা হয়েছে। ভারত থেকে হাজার হাজার শরণার্থীকে সম্মানের সঙ্গে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসন করা হয়েছে। কিন্তু জেএসএস মূল সত্য আড়াল করছে নিজেদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের জায়গাটিতে। শান্তিবাহিনীর বিশাল অংশ অস্ত্র জমা দেওয়ার নাটক করলেও সব অস্ত্র সমর্পণ করেনি। চার ধাপে মাত্র ১,৯৪০টি অস্ত্র জমা পড়ে। ইতিহাসবিদ ও গবেষক গোলাম মুর্তুজার 'শান্তিবাহিনীর গেরিলা জীবন' গ্রন্থে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, ১৯৭৫ সালেই শান্তিবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৫,০০০। ২২ বছর পর এই সশস্ত্র দলের সমর্পিত অস্ত্রের সংখ্যা মাত্র ১,৯৪০ হবে কেন? বাকি আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রগুলো কোথায় গেল? ২০১৩ সালে বেসরকারি ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক শামীমা বিনতেকে ২০১৩ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খোদ সন্তু লারমা স্বীকার করেছেন, চুক্তির পরও তাদের সশস্ত্র জনবল রয়েছে। চুক্তির সময় তারা সশস্ত্র কার্যক্রম সীমিত করেছিল কিন্তু সম্পূর্ণ জমা দেয়নি।

জেএসএস এর মিথ্যা অভিযোগের সত্যটি হলো, জেএসএস ও তাদের সমমনা আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সেই সমর্পিত না হওয়া অস্ত্র দিয়ে আজও পাহাড়ে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বজায় রেখেছে। জেএসএস, ইউপিডিএফ কিংবা কেএনএফ-এর মতো সশস্ত্র দলগুলো পাহাড়ে নিয়মিত চাঁদাবাজি, অপহরণ, খুন ও গুমের ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে। তারা নিজস্ব প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলকে নির্মমভাবে দমন করছে। পাহাড়ের নিরীহ উপজাতি এবং বাঙালি জনগোষ্ঠী উভয়েই এই সশস্ত্র সংগঠনগুলোর অব্যাহত জুলুম ও চাঁদাবাজির প্রধান শিকার।

ইউএনপিও অধিবেশনে জেএসএস আরও অভিযোগ তোলে, "পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে একের পর এক সরকার ব্যাপক সামরিকায়ন করে ফ্যাসিবাদী কায়দায় দমন-পীড়নের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানের নীতি অনুসরণ করে আসছে। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে সামরিকায়িত অঞ্চল। 'অপারেশন উত্তরণ' নামক সেনাশাসন সহ পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে চার শতাধিক অস্থায়ী ক্যাম্প কার্যকর রয়েছে।"

এই অপপ্রচারের আড়ালে রয়েছে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মূল সত্য। চুক্তির শর্ত মেনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ইতিমধ্যে পার্বত্য অঞ্চল থেকে ২৩৯টি স্থায়ী ও অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করেছে। অথচ পাহাড়ে রক্তপাত বন্ধ হয়নি। কারণ জেএসএস সীমান্ত পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে নিয়মিত অবৈধ অস্ত্র এনে নিজেদের অস্ত্রাগার সমৃদ্ধ করছে। ভারতের মিজোরাম পুলিশের হাতে জেএসএস-এর একাধিক অস্ত্রের বিশাল চালান জব্দের ঘটনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নথিভুক্ত রয়েছে। ত্রিদেশীয় সীমান্ত (বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার) দিয়ে অবৈধ অস্ত্রের প্রবাহ বজায় রেখে জুম্মল্যান্ড বা পৃথক রাজ্যের স্বপ্ন দেখা গোষ্ঠীগুলো সশস্ত্র অবস্থান ধরে রেখেছে। নিরাপত্তা বাহিনী যদি সেখানে সার্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষা না করত, তবে পাহাড়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ত।

জেএসএস রেজুলেশনে অভিযোগ করেছে, "ফলে পূর্বের মতই নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক জুম্ম জনগণের উপর নানা ধরনের নিপীড়ন, মানবাধিকার হরণ, সেনামদদপুষ্ট সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কর্তৃক পার্বত্য চুক্তির সমর্থক ও নিরীহ জুম্মদের উপর সন্ত্রাস, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে আন্দোলনরত ব্যক্তি ও সংগঠনদের 'সন্ত্রাসী', 'অস্ত্রধারী', 'বিচ্ছিন্নতাবাদী' ইত্যাদি তকমা দিয়ে অপরাধীকরণ, সেটেলার বাঙালি ও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের কর্তৃক জুম্মদেরকে সাম্প্রদায়িক হামলা, হয়রানি, ভূমি বেদখল, পার্বত্য চুক্তি বিরোধী তৎপরতা, ধর্মান্তরকরণ ও জুম্ম নারী-শিশুদের উপর সহিংসতা ইত্যাদি অব্যাহত রয়েছে।"

এই বক্তব্য পুরোপুরি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। প্রথমত, পার্বত্যাঞ্চলে কোনো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব নেই। মায়ানমারের সামরিক জান্তার গণহত্যার শিকার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ সরকার সম্পূর্ণ মানবিক কারণে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ ও ভাসানচরে আশ্রয় দিয়েছে। পার্বত্যাঞ্চলে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে জেএসএস-এর দাবি তাদের আন্তর্জাতিক সহানুভূতি আদায়ের রাজনৈতিক হাতিয়ার ছাড়া কিছু নয়। দ্বিতীয়ত, পার্বত্য এলাকায় কোনো ইসলামিকরণ বা জোরপূর্বক ধর্মান্তর ঘটছে না। মূল ঘটনা হচ্ছে, দারিদ্র্য ও অসচেতনতার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এনজিও এবং মিশনারি সংস্থা পাহাড়ে ব্যাপক ধর্মান্তরকরণ চালিয়ে যাচ্ছে। বান্দরবানের ক্ষুদ্র চাক সম্প্রদায়সহ চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ আজ খ্রিস্ট ধর্মে রূপান্তরিত হচ্ছে। জেএসএস এই পশ্চিমা মিশনারিদের ধর্মান্তর প্রক্রিয়াকে সুকৌশলে আড়াল করে রাষ্ট্রের ওপর মিথ্যা দোষারোপ করছে।

ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির নামে জেএসএস বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা কায়েমের চেষ্টা করছে। তাদের রেজুলেশনে দাবিকৃত সুপারিশটি হলো:

"অচিরেই পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের বিধিমালা প্রণয়ন করে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি পূর্বক জুম্মদের বেহাত হওয়া জায়গা-জমি প্রত্যর্পণ করা।"

বাস্তবতা হলো, সরকার ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তি ও তথাকথিত শাসনবিধি অনুযায়ী ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠন করেছে। কিন্তু আইনগত ও নৈতিকভাবে কোনো নিরপেক্ষ বিচার কাঠামো গঠিত হতে হলে তাতে বিরোধের সব পক্ষ সমান সুযোগ পাবে। এই কমিশনের ৯ জন সদস্যের মধ্যে ৭ জনই উপজাতি প্রতিনিধি এবং ২ জন সরকারি প্রতিনিধি। সেখানে পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী বিরাটসংখ্যক বাঙালি জনগোষ্ঠীর কোনো প্রতিনিধিত্বই রাখা হয়নি। অধিকন্তু, এই কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধে প্রচলিত আদালতে কোনো আপিল করার সুযোগ নেই এবং এটি দেশের সংবিধান ও সাধারণ ভূমি আইন অনুসরণ করে না।

একতরফা ব্যবস্থার মাধ্যমে বাঙালিদের ভূমি অধিকার ক্ষুন্ন করার যে ষড়যন্ত্র জেএসএস করছে, তা আইনগতভাবে অগ্রহণযোগ্য ও বৈষম্যমূলক।

নেদারল্যান্ডসের হেগ অধিবেশনে প্রীতিবিন্দু চাকমা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে যে রেজুলেশনের প্রস্তাবসমূহ হুবহু পেশ করেছেন, তা নিম্নরূপ:

(ক) বাংলাদেশ সরকারের প্রতি:

১) পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সময়সূচি ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা (রোডম্যাপ) ঘোষণা করা।

২) পার্বত্য চট্টগ্রামকে বেসামরিকীকরণের লক্ষ্যে 'অপারেশন উত্তরণ' নামক সেনাশাসন সহ সকল অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার করা।

৩) অচিরেই পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের বিধিমালা প্রণয়ন করে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি পূর্বক জুম্মদের বেহাত হওয়া জায়গা-জমি প্রত্যর্পণ করা।

(খ) আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি:

১) পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ সরকারের উপর রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রদান করা।

২) পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িত বাংলাদেশ সেনা সদস্যাদেরকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনে নিয়োগ না করা।

৩) পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জুম্মদের মানবাধিকার পরিস্থিতি সরেজমিন তদন্তের জন্য জাতিসংঘের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক স্পেশাল র‍্যাপোটিয়রকে বাংলাদেশ সফরের উদ্যোগ গ্রহণ করা।

(গ) বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতি:

১) পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সারাদেশে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা।

hwf বলছে, এই সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, জেএসএস বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে একটি মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ বন্ধের চক্রান্ত করছে।

অস্ত্রের শক্তি আর শান্তিপাত কখনো একসঙ্গে চলতে পারে না। জেএসএস-কে যদি সত্যি চুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক হতে হয়, তবে সর্বাগ্রে তাদের সম্পূর্ণ অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে এবং হত্যা, গুম ও চাঁদাবাজির রাজনীতি বর্জন করতে হবে। রাষ্ট্রের শিথিল নীতির সুযোগ নিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সার্বভৌমত্ব ও সেনাবাহিনীর সম্মান বিনষ্ট করার সুযোগ আর দেওয়া যায় না। পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ; সেখানে অপপ্রচার চালিয়ে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে দেওয়া হবে না।

আপনার মতামত লিখুন

চ্যানেল সিএইচটি

সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬


ইউএনপিও অধিবেশনে 'পার্বত্য চুক্তি ও সেনাবাহিনী' নিয়ে জেএসএস এর মিথ্যা রেজুলেশন পাশঃ

প্রকাশের তারিখ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে গত ২৯-৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে আনরিপ্রেজেন্টেড নেশনস অ্যান্ড পিপলস অর্গানাইজেশনের (ইউএনপিও) ২১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত আন্তর্জাতিক সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ২৯ আগস্ট শনিবার, প্রথম দিনের অধিবেশনে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) পক্ষে প্রতিনিধি হিসেবে প্রীতিবিন্দু চাকমা ও ইঞ্জেবি চাকমা অংশগ্রহণ করেন। সভায় প্রীতিবিন্দু চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রামের ওপর একটি বিভ্রান্তিকর রেজুলেশন উপস্থাপন করেন এবং তা সেখানে পাস করিয়ে নেন।

জেএসএস প্রতিনিধিরা আন্তর্জাতিক মঞ্চে যে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন, তা বাস্তবতার সম্পূর্ণ বিপরীত। বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে এটি এক গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। জেএসএস সেখানে দাবি করেছে, "পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর ২৯ বছর অতিক্রান্ত হলেও চুক্তির মৌলিক বিষয়সহ চুক্তির দুই-তৃতীয়াংশ ধারা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।" তাদের এই বক্তব্য বস্তুনিষ্ঠ সত্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।


সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৯৭ সালের চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৬৮টি ধারাই বেশিরভাগ বাস্তবায়িত হয়েছে অথবা চূড়ান্ত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। অর্থাৎ শতাংশের হিসাবে চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি ৯০ ভাগের বেশি। চুক্তির শর্তানুসারে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠিত হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ পুনর্গঠিত হয়েছে এবং ১৯৮৯ সালের আইন সংশোধন করে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদকে স্থানীয় শাসন কাঠামোর আওতায় সংহত করা হয়েছে। ভারত থেকে হাজার হাজার শরণার্থীকে সম্মানের সঙ্গে ফিরিয়ে এনে পুনর্বাসন করা হয়েছে। কিন্তু জেএসএস মূল সত্য আড়াল করছে নিজেদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের জায়গাটিতে। শান্তিবাহিনীর বিশাল অংশ অস্ত্র জমা দেওয়ার নাটক করলেও সব অস্ত্র সমর্পণ করেনি। চার ধাপে মাত্র ১,৯৪০টি অস্ত্র জমা পড়ে। ইতিহাসবিদ ও গবেষক গোলাম মুর্তুজার 'শান্তিবাহিনীর গেরিলা জীবন' গ্রন্থে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, ১৯৭৫ সালেই শান্তিবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৫,০০০। ২২ বছর পর এই সশস্ত্র দলের সমর্পিত অস্ত্রের সংখ্যা মাত্র ১,৯৪০ হবে কেন? বাকি আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রগুলো কোথায় গেল? ২০১৩ সালে বেসরকারি ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক শামীমা বিনতেকে ২০১৩ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খোদ সন্তু লারমা স্বীকার করেছেন, চুক্তির পরও তাদের সশস্ত্র জনবল রয়েছে। চুক্তির সময় তারা সশস্ত্র কার্যক্রম সীমিত করেছিল কিন্তু সম্পূর্ণ জমা দেয়নি।

জেএসএস এর মিথ্যা অভিযোগের সত্যটি হলো, জেএসএস ও তাদের সমমনা আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সেই সমর্পিত না হওয়া অস্ত্র দিয়ে আজও পাহাড়ে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বজায় রেখেছে। জেএসএস, ইউপিডিএফ কিংবা কেএনএফ-এর মতো সশস্ত্র দলগুলো পাহাড়ে নিয়মিত চাঁদাবাজি, অপহরণ, খুন ও গুমের ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে। তারা নিজস্ব প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলকে নির্মমভাবে দমন করছে। পাহাড়ের নিরীহ উপজাতি এবং বাঙালি জনগোষ্ঠী উভয়েই এই সশস্ত্র সংগঠনগুলোর অব্যাহত জুলুম ও চাঁদাবাজির প্রধান শিকার।

ইউএনপিও অধিবেশনে জেএসএস আরও অভিযোগ তোলে, "পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে একের পর এক সরকার ব্যাপক সামরিকায়ন করে ফ্যাসিবাদী কায়দায় দমন-পীড়নের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সমাধানের নীতি অনুসরণ করে আসছে। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে সামরিকায়িত অঞ্চল। 'অপারেশন উত্তরণ' নামক সেনাশাসন সহ পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে চার শতাধিক অস্থায়ী ক্যাম্প কার্যকর রয়েছে।"

এই অপপ্রচারের আড়ালে রয়েছে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মূল সত্য। চুক্তির শর্ত মেনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ইতিমধ্যে পার্বত্য অঞ্চল থেকে ২৩৯টি স্থায়ী ও অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করেছে। অথচ পাহাড়ে রক্তপাত বন্ধ হয়নি। কারণ জেএসএস সীমান্ত পেরিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে নিয়মিত অবৈধ অস্ত্র এনে নিজেদের অস্ত্রাগার সমৃদ্ধ করছে। ভারতের মিজোরাম পুলিশের হাতে জেএসএস-এর একাধিক অস্ত্রের বিশাল চালান জব্দের ঘটনা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নথিভুক্ত রয়েছে। ত্রিদেশীয় সীমান্ত (বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার) দিয়ে অবৈধ অস্ত্রের প্রবাহ বজায় রেখে জুম্মল্যান্ড বা পৃথক রাজ্যের স্বপ্ন দেখা গোষ্ঠীগুলো সশস্ত্র অবস্থান ধরে রেখেছে। নিরাপত্তা বাহিনী যদি সেখানে সার্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষা না করত, তবে পাহাড়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ত।

জেএসএস রেজুলেশনে অভিযোগ করেছে, "ফলে পূর্বের মতই নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক জুম্ম জনগণের উপর নানা ধরনের নিপীড়ন, মানবাধিকার হরণ, সেনামদদপুষ্ট সন্ত্রাসী গোষ্ঠী কর্তৃক পার্বত্য চুক্তির সমর্থক ও নিরীহ জুম্মদের উপর সন্ত্রাস, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে আন্দোলনরত ব্যক্তি ও সংগঠনদের 'সন্ত্রাসী', 'অস্ত্রধারী', 'বিচ্ছিন্নতাবাদী' ইত্যাদি তকমা দিয়ে অপরাধীকরণ, সেটেলার বাঙালি ও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের কর্তৃক জুম্মদেরকে সাম্প্রদায়িক হামলা, হয়রানি, ভূমি বেদখল, পার্বত্য চুক্তি বিরোধী তৎপরতা, ধর্মান্তরকরণ ও জুম্ম নারী-শিশুদের উপর সহিংসতা ইত্যাদি অব্যাহত রয়েছে।"

এই বক্তব্য পুরোপুরি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। প্রথমত, পার্বত্যাঞ্চলে কোনো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব নেই। মায়ানমারের সামরিক জান্তার গণহত্যার শিকার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ সরকার সম্পূর্ণ মানবিক কারণে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফ ও ভাসানচরে আশ্রয় দিয়েছে। পার্বত্যাঞ্চলে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে জেএসএস-এর দাবি তাদের আন্তর্জাতিক সহানুভূতি আদায়ের রাজনৈতিক হাতিয়ার ছাড়া কিছু নয়। দ্বিতীয়ত, পার্বত্য এলাকায় কোনো ইসলামিকরণ বা জোরপূর্বক ধর্মান্তর ঘটছে না। মূল ঘটনা হচ্ছে, দারিদ্র্য ও অসচেতনতার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এনজিও এবং মিশনারি সংস্থা পাহাড়ে ব্যাপক ধর্মান্তরকরণ চালিয়ে যাচ্ছে। বান্দরবানের ক্ষুদ্র চাক সম্প্রদায়সহ চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ আজ খ্রিস্ট ধর্মে রূপান্তরিত হচ্ছে। জেএসএস এই পশ্চিমা মিশনারিদের ধর্মান্তর প্রক্রিয়াকে সুকৌশলে আড়াল করে রাষ্ট্রের ওপর মিথ্যা দোষারোপ করছে।

ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির নামে জেএসএস বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা কায়েমের চেষ্টা করছে। তাদের রেজুলেশনে দাবিকৃত সুপারিশটি হলো:

"অচিরেই পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের বিধিমালা প্রণয়ন করে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি পূর্বক জুম্মদের বেহাত হওয়া জায়গা-জমি প্রত্যর্পণ করা।"

বাস্তবতা হলো, সরকার ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তি ও তথাকথিত শাসনবিধি অনুযায়ী ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠন করেছে। কিন্তু আইনগত ও নৈতিকভাবে কোনো নিরপেক্ষ বিচার কাঠামো গঠিত হতে হলে তাতে বিরোধের সব পক্ষ সমান সুযোগ পাবে। এই কমিশনের ৯ জন সদস্যের মধ্যে ৭ জনই উপজাতি প্রতিনিধি এবং ২ জন সরকারি প্রতিনিধি। সেখানে পার্বত্য এলাকায় বসবাসকারী বিরাটসংখ্যক বাঙালি জনগোষ্ঠীর কোনো প্রতিনিধিত্বই রাখা হয়নি। অধিকন্তু, এই কমিশনের রায়ের বিরুদ্ধে প্রচলিত আদালতে কোনো আপিল করার সুযোগ নেই এবং এটি দেশের সংবিধান ও সাধারণ ভূমি আইন অনুসরণ করে না।

একতরফা ব্যবস্থার মাধ্যমে বাঙালিদের ভূমি অধিকার ক্ষুন্ন করার যে ষড়যন্ত্র জেএসএস করছে, তা আইনগতভাবে অগ্রহণযোগ্য ও বৈষম্যমূলক।

নেদারল্যান্ডসের হেগ অধিবেশনে প্রীতিবিন্দু চাকমা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে যে রেজুলেশনের প্রস্তাবসমূহ হুবহু পেশ করেছেন, তা নিম্নরূপ:

(ক) বাংলাদেশ সরকারের প্রতি:

১) পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সময়সূচি ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা (রোডম্যাপ) ঘোষণা করা।

২) পার্বত্য চট্টগ্রামকে বেসামরিকীকরণের লক্ষ্যে 'অপারেশন উত্তরণ' নামক সেনাশাসন সহ সকল অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহার করা।

৩) অচিরেই পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের বিধিমালা প্রণয়ন করে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি পূর্বক জুম্মদের বেহাত হওয়া জায়গা-জমি প্রত্যর্পণ করা।

(খ) আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি:

১) পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ সরকারের উপর রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রদান করা।

২) পার্বত্য চট্টগ্রামে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িত বাংলাদেশ সেনা সদস্যাদেরকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনে নিয়োগ না করা।

৩) পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জুম্মদের মানবাধিকার পরিস্থিতি সরেজমিন তদন্তের জন্য জাতিসংঘের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক স্পেশাল র‍্যাপোটিয়রকে বাংলাদেশ সফরের উদ্যোগ গ্রহণ করা।

(গ) বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের প্রতি:

১) পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সারাদেশে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা।

hwf বলছে, এই সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, জেএসএস বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে একটি মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ বন্ধের চক্রান্ত করছে।

অস্ত্রের শক্তি আর শান্তিপাত কখনো একসঙ্গে চলতে পারে না। জেএসএস-কে যদি সত্যি চুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক হতে হয়, তবে সর্বাগ্রে তাদের সম্পূর্ণ অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে এবং হত্যা, গুম ও চাঁদাবাজির রাজনীতি বর্জন করতে হবে। রাষ্ট্রের শিথিল নীতির সুযোগ নিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ড পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের সার্বভৌমত্ব ও সেনাবাহিনীর সম্মান বিনষ্ট করার সুযোগ আর দেওয়া যায় না। পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ; সেখানে অপপ্রচার চালিয়ে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে দেওয়া হবে না।


চ্যানেল সিএইচটি

সম্পাদক : এইচ এ আব্দুর রউফ, উপদেষ্টা : কামাল পারভেজ
কপিরাইট © ২০২৬ চ্যানেল সিএইচটি । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত