স্বাধীনতার পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে রাজনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত নানা ঘটনা দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও বিতর্কিত একটি নাম হলো কল্পনা চাকমা। প্রায় তিন দশক ধরে তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহলে আলোচনা, আন্দোলন, বিবৃতি এবং মতবিরোধ চলে আসছে। একপক্ষ এই ঘটনাকে অপহরণ হিসেবে তুলে ধরে বিচার দাবি করে আসছে, অন্যদিকে আরেকপক্ষ মনে করে বিষয়টি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে অনেক প্রশ্নের উত্তর আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
১৯৯৬ সালে কল্পনা চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রাম হিল উইমেন্স ফেডারেশনের (এইচডব্লিউএফ) একজন সক্রিয় নেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সে সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত। তখন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক সংগঠনের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা ও মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, আলোচিত কল্পনা চাকমা তার নিজস্ব সংগঠনের রাজনৈতিক অবস্থানের বাইরে গিয়ে একটি জাতীয় রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাতে শুরু করেন। এতে তার সংগঠনের ভেতরে অসন্তোষ ও বিরোধ তৈরি হয় এবং তিনি বিভিন্ন ধরনের চাপ ও হুমকির মুখে পড়েন।
বিষয়টির আরেকটি আলোচিত দিক হলো কল্পনা চাকমার ব্যক্তিগত জীবন। নির্ভরযোগ্য সূত্রে দাবি করা হয় যে, ভারতের অরুণাচল প্রদেশের রাজনৈতিক কর্মী অরুণ বিকাশ চাকমার সঙ্গে কল্পনা চাকমার ঘনিষ্ঠ/প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগ ও সম্পর্ক বজায় ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। একদিকে তাঁদের প্রেমের সম্পর্ক পরিবার মেনে নিচ্ছিলো না, অন্যদিকে রাজনৈতিক চাপসহ, পারিবারিক জটিলতা এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের কারণে কল্পনা চাকমা গোপনে তার প্রেমিকের কাছে দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যান। পরবর্তীতে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন, কখনো জেএসএস আবার কখনো ইউপিডিএফ তার অনুপস্থিতিকে অপহরণ হিসেবে প্রচার করে এবং সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রচারণা গড়ে ওঠে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড়ের আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন ইউপিডিএফ-জেএসএস তাদের দীর্ঘদিন আধিপত্য বিস্তার ও সশস্ত্র রাজনীতি সক্রিয় রাখতে মূলত কল্পনা চাকমার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনী, বিশেষ করে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে একটি নেতিবাচক প্রচারণা চালায়। এই ইস্যুকে ব্যবহার করে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলো আন্তর্জাতিক মহলে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি সম্পর্কে একপাক্ষিক ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, একটি ঘটনার সত্যতা সম্পূর্ণভাবে প্রমাণিত হওয়ার আগেই সেটিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং তা থেকে বিভিন্ন মহল নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামে গত কয়েক দশকে অসংখ্য অপহরণ, হত্যা, গুম, নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার অনেকগুলোর শিকার হয়েছেন সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মানুষ। এসকল ঘটনার মূলে রয়েছে ইউপিডিএফ, জেএসএস সহ পাহাড়ের আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। তাদের বিরুদ্ধে অসংখ্য সাধারণ নাগরিকদের অপহরণ, চাঁদাবাজি, হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু এসব ঘটনার অনেকই জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তেমন গুরুত্ব পায়নি।
বিভিন্ন সময়ে রিনা ত্রিপুরা, দীপা ত্রিপুরা, আয়না চাকমা, জোসনা চাকমা, মিতালী চাকমা, রিমি চাকমা, স্বপ্না চাকমাসহ অনেক নারীর অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। এসব ঘটনার অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার দাবি করলেও ব্যাপক জনমত বা আন্তর্জাতিক প্রচারণা দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তোলেন, যদি মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারই মূল বিষয় হয়, তাহলে কেবল একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্দোলন হবে কেন, আর অন্যান্য ভুক্তভোগীরা কেন একই গুরুত্ব পাবেন না?
একইভাবে পার্বত্য অঞ্চলে বহু মানুষ পাহাড়ের আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন দ্বারা অপহরণের শিকার হয়ে আজও নিখোঁজ রয়েছেন। অনেক পরিবার বছরের পর বছর ধরে তাদের স্বজনদের খুঁজে ফিরছে। কেউ কেউ অপহরণের পর মুক্তি পেলেও নির্যাতনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। আবার অনেকে কখনোই ফিরে আসেননি। এসব পরিবারের কষ্ট, নিরাপত্তাহীনতা এবং বিচার না পাওয়ার বেদনা প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়।
পার্বত্য রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম এমএন লারমা। তাকে অনেকেই পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু তার হত্যাকাণ্ডের বিচার বা তদন্ত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তেমন কোনো বড় ধরনের আন্দোলন বা কর্মসূচি দেখা যায়নি বলেও সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেন। তাদের মতে, যদি ঐতিহাসিক গুরুত্বের দিক থেকে বিবেচনা করা হয়, তাহলে এমএন লারমার হত্যাকাণ্ডও সমান গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে কল্পনা চাকমা ইস্যু যেভাবে আলোচিত হয়েছে, অন্যান্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সেই মাত্রার গুরুত্ব পায়নি।
এ কারণে অনেকের ধারণা, কল্পনা চাকমা ইস্যুটি শুধুমাত্র মানবাধিকার বা ন্যায়বিচারের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে ব্যবহৃত একটি বিষয়। তাদের মতে, বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্য ঘটনাটিকে কাজে লাগিয়েছে। ফলে প্রকৃত সত্য অনুসন্ধানের চেয়ে রাজনৈতিক বিতর্কই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো স্পর্শকাতর অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং পারস্পরিক আস্থা গড়ে তুলতে হলে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন দ্বারা সব ধরনের সহিংসতা, অপহরণ, হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার সমান গুরুত্বে তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা বা ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে আবেগ সৃষ্টি করার পরিবর্তে সামগ্রিকভাবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পাহাড়ের প্রতিটি ভুক্তভোগী মানুষ সমান মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের দাবিদার।
কল্পনা চাকমা ইস্যু এখনো একটি বিতর্কিত এবং বহুমাত্রিক বিষয়। এ ঘটনাকে ঘিরে নানা দাবি, পাল্টা দাবি এবং রাজনৈতিক ব্যাখ্যা রয়েছে। কিন্তু সত্য যাই হোক না কেন, দীর্ঘদিনের এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ অনুসন্ধান, তথ্যভিত্তিক আলোচনা এবং সকল ভুক্তভোগীর জন্য সমান ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের স্বার্থে বিভাজন নয়, বরং সত্য অনুসন্ধান ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই হওয়া উচিত সকলের প্রধান লক্ষ্য।
লেখক: পার্বত্য চট্টগ্রাম।

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুন ২০২৬
স্বাধীনতার পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে রাজনৈতিক, সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত নানা ঘটনা দেশের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও বিতর্কিত একটি নাম হলো কল্পনা চাকমা। প্রায় তিন দশক ধরে তার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহলে আলোচনা, আন্দোলন, বিবৃতি এবং মতবিরোধ চলে আসছে। একপক্ষ এই ঘটনাকে অপহরণ হিসেবে তুলে ধরে বিচার দাবি করে আসছে, অন্যদিকে আরেকপক্ষ মনে করে বিষয়টি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে অনেক প্রশ্নের উত্তর আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে।
১৯৯৬ সালে কল্পনা চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রাম হিল উইমেন্স ফেডারেশনের (এইচডব্লিউএফ) একজন সক্রিয় নেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সে সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত। তখন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক সংগঠনের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা ও মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, আলোচিত কল্পনা চাকমা তার নিজস্ব সংগঠনের রাজনৈতিক অবস্থানের বাইরে গিয়ে একটি জাতীয় রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা চালাতে শুরু করেন। এতে তার সংগঠনের ভেতরে অসন্তোষ ও বিরোধ তৈরি হয় এবং তিনি বিভিন্ন ধরনের চাপ ও হুমকির মুখে পড়েন।
বিষয়টির আরেকটি আলোচিত দিক হলো কল্পনা চাকমার ব্যক্তিগত জীবন। নির্ভরযোগ্য সূত্রে দাবি করা হয় যে, ভারতের অরুণাচল প্রদেশের রাজনৈতিক কর্মী অরুণ বিকাশ চাকমার সঙ্গে কল্পনা চাকমার ঘনিষ্ঠ/প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগ ও সম্পর্ক বজায় ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। একদিকে তাঁদের প্রেমের সম্পর্ক পরিবার মেনে নিচ্ছিলো না, অন্যদিকে রাজনৈতিক চাপসহ, পারিবারিক জটিলতা এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের কারণে কল্পনা চাকমা গোপনে তার প্রেমিকের কাছে দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যান। পরবর্তীতে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন, কখনো জেএসএস আবার কখনো ইউপিডিএফ তার অনুপস্থিতিকে অপহরণ হিসেবে প্রচার করে এবং সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রচারণা গড়ে ওঠে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড়ের আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন ইউপিডিএফ-জেএসএস তাদের দীর্ঘদিন আধিপত্য বিস্তার ও সশস্ত্র রাজনীতি সক্রিয় রাখতে মূলত কল্পনা চাকমার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনী, বিশেষ করে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে একটি নেতিবাচক প্রচারণা চালায়। এই ইস্যুকে ব্যবহার করে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলো আন্তর্জাতিক মহলে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি সম্পর্কে একপাক্ষিক ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করে। সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, একটি ঘটনার সত্যতা সম্পূর্ণভাবে প্রমাণিত হওয়ার আগেই সেটিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং তা থেকে বিভিন্ন মহল নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামে গত কয়েক দশকে অসংখ্য অপহরণ, হত্যা, গুম, নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার অনেকগুলোর শিকার হয়েছেন সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মানুষ। এসকল ঘটনার মূলে রয়েছে ইউপিডিএফ, জেএসএস সহ পাহাড়ের আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। তাদের বিরুদ্ধে অসংখ্য সাধারণ নাগরিকদের অপহরণ, চাঁদাবাজি, হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু এসব ঘটনার অনেকই জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তেমন গুরুত্ব পায়নি।
বিভিন্ন সময়ে রিনা ত্রিপুরা, দীপা ত্রিপুরা, আয়না চাকমা, জোসনা চাকমা, মিতালী চাকমা, রিমি চাকমা, স্বপ্না চাকমাসহ অনেক নারীর অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। এসব ঘটনার অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার দাবি করলেও ব্যাপক জনমত বা আন্তর্জাতিক প্রচারণা দেখা যায়নি। সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তোলেন, যদি মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারই মূল বিষয় হয়, তাহলে কেবল একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্দোলন হবে কেন, আর অন্যান্য ভুক্তভোগীরা কেন একই গুরুত্ব পাবেন না?
একইভাবে পার্বত্য অঞ্চলে বহু মানুষ পাহাড়ের আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন দ্বারা অপহরণের শিকার হয়ে আজও নিখোঁজ রয়েছেন। অনেক পরিবার বছরের পর বছর ধরে তাদের স্বজনদের খুঁজে ফিরছে। কেউ কেউ অপহরণের পর মুক্তি পেলেও নির্যাতনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। আবার অনেকে কখনোই ফিরে আসেননি। এসব পরিবারের কষ্ট, নিরাপত্তাহীনতা এবং বিচার না পাওয়ার বেদনা প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়।
পার্বত্য রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম এমএন লারমা। তাকে অনেকেই পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে বিবেচনা করেন। কিন্তু তার হত্যাকাণ্ডের বিচার বা তদন্ত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তেমন কোনো বড় ধরনের আন্দোলন বা কর্মসূচি দেখা যায়নি বলেও সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেন। তাদের মতে, যদি ঐতিহাসিক গুরুত্বের দিক থেকে বিবেচনা করা হয়, তাহলে এমএন লারমার হত্যাকাণ্ডও সমান গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে কল্পনা চাকমা ইস্যু যেভাবে আলোচিত হয়েছে, অন্যান্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সেই মাত্রার গুরুত্ব পায়নি।
এ কারণে অনেকের ধারণা, কল্পনা চাকমা ইস্যুটি শুধুমাত্র মানবাধিকার বা ন্যায়বিচারের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ও কৌশলগতভাবে ব্যবহৃত একটি বিষয়। তাদের মতে, বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করার জন্য ঘটনাটিকে কাজে লাগিয়েছে। ফলে প্রকৃত সত্য অনুসন্ধানের চেয়ে রাজনৈতিক বিতর্কই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো স্পর্শকাতর অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং পারস্পরিক আস্থা গড়ে তুলতে হলে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন দ্বারা সব ধরনের সহিংসতা, অপহরণ, হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার সমান গুরুত্বে তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা বা ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে আবেগ সৃষ্টি করার পরিবর্তে সামগ্রিকভাবে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার দিকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। পাহাড়ের প্রতিটি ভুক্তভোগী মানুষ সমান মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের দাবিদার।
কল্পনা চাকমা ইস্যু এখনো একটি বিতর্কিত এবং বহুমাত্রিক বিষয়। এ ঘটনাকে ঘিরে নানা দাবি, পাল্টা দাবি এবং রাজনৈতিক ব্যাখ্যা রয়েছে। কিন্তু সত্য যাই হোক না কেন, দীর্ঘদিনের এই বিতর্কের অবসান ঘটাতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ অনুসন্ধান, তথ্যভিত্তিক আলোচনা এবং সকল ভুক্তভোগীর জন্য সমান ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের স্বার্থে বিভাজন নয়, বরং সত্য অনুসন্ধান ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই হওয়া উচিত সকলের প্রধান লক্ষ্য।
লেখক: পার্বত্য চট্টগ্রাম।

আপনার মতামত লিখুন