সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ঢাকা
চ্যানেল সিএইচটি

দুই দশকেও বদলায়নি ভাগ্য: রামগড়ের পরিত্যক্ত আবাসিক বিদ্যালয় ও আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি।



দুই দশকেও বদলায়নি ভাগ্য: রামগড়ের পরিত্যক্ত আবাসিক বিদ্যালয় ও আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি।

পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় উপজেলা সদর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে তৈচালা পাড়ায় পাহাড়ের চূড়ায় ১২ একর জায়গাজুড়ে এক যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে ২০০৪ সালে শুরু হয়েছিলো এক আবাসিক বিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ। দুর্গম পাহাড়ের অনাথ, এতিম ও দরিদ্র শিশুদের বিনামূল্যে শিক্ষার আলো দিতে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে নির্মিত এই ভবন ২০০৬ সালে উদ্বোধন হলেও দুই দশক ধরে চালু হয়নি। পরবর্তীতে ১/১১ এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পরবর্তীতে আসা সরকারের দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পরও সচল হয়নি সম্ভাবনাময় এই প্রকল্প। পরিচর্যার অভাবে আজ শ্রেণিকক্ষের মরচে ধরা জানালা, খসে পড়া ইট-পাথরে তৈরি দেয়াল ও অকেজো পড়ে থাকা আবাসিক আসবাবপত্র কেবল সরকারি অর্থ অপচয়ের এক নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে রাঙামাটির রাজস্থলী এবং বান্দরবানের রুমায় সমসাময়িক প্রকল্পগুলো পরবর্তীতে সফলভাবে চালু হলেও রামগড়ের এই বিদ্যালয়টি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনীতির মারপ্যাঁচে আটকা পড়ে। অথচ ২০০৭ সালে এখানে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করা হয়েছিলো এবং ২০০৮ সালের শুরুতেই ১২০ জন অনাথ বালক-বালিকার ভর্তির আবেদনও নেওয়া সম্পন্ন হয়েছিলো। কিন্তু রহস্যজনক কারণে শেষ মুহূর্তে বিদ্যালয়টির কার্যক্রম বাতিল করা হয় এবং কর্মী ও শিক্ষার্থীদের ভর্তি স্থগিত হয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ে নির্মিত একটি জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের এত কাছাকাছি এসেও দীর্ঘ ২০ বছর স্থবির হয়ে থাকা অত্যন্ত মর্মান্তিক।

যেকোনো দেশ বা অঞ্চলে উন্নয়ন প্রকল্প সরকারের পরিবর্তন সাপেক্ষে থেমে যাওয়া কোনো সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচয় দেয় না। যেকোনো মেয়াদে যে সরকারই কোনো প্রকল্পের সূচনা করুক না কেন, তা মূলত জনগণের করের টাকায় নির্মিত রাষ্ট্রের সম্পদ। পরবর্তী ক্ষমতায় আসা দলগুলোর নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পূর্ববর্তী সরকারের জনহিতকর কাজগুলোকে সচল রাখা ও সংরক্ষণ করা। কিন্তু রাজনৈতিক মতভিন্নতা ও কৃতিত্ব না দেওয়ার প্রবণতার কারণে যদি এমন প্রস্তুতকৃত অবকাঠামো যুগের পর যুগ অবহেলায় ফেলে রেখে "ভূতের বাড়িতে" পরিণত করা হয়, তবে তার খেসারত দিতে হয় সাধারণ জনগণকে।

আমাদের দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা হিংসাত্মক মনোভাব ও পরস্পরকে অস্বীকার করার চর্চা অনেক ভালো উদ্যোগকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করেছে। এক সরকারের উন্নয়ন অন্য সরকার এসে উপেক্ষা করবে বা নস্যাৎ করে দিয়ে নতুন করে বিপুল খরচে প্রকল্প হাতে নেবে, এই চিন্তাধারা দেশের অর্থনীতির ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করে। অন্য দলের নেওয়া সিদ্ধান্ত হলেও যদি তা জনগণের উপকার সাধন করে, তবে তা সানন্দে গ্রহণ করাই প্রকৃত রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। রামগড়ের এই বন্ধ হয়ে থাকা আবাসিক বিদ্যালয়টি রাজনৈতিক সংকীর্ণতার এমনই এক বলির পাঠা, যা পাহাড়ের শত শত শিশুর শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হওয়ার মূল কারণ।

সম্প্রতি খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার স্থানীয় সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের নেতৃবৃন্দ সরেজমিন পরিদর্শন ও বিদ্যালয়টি পুনরায় চালুর উদ্যোগ বিশেষ করে খাগড়াছড়ির জন্য একটি বড় ইতিবাচক বার্তা বহন করে। ২০০৬ সালে তৎকালীন খাগড়াছড়ি জেলার সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালে তার হাত ধরেই এই প্রকল্পের সূচনা হয়েছিলো এবং তিনিই এই বিদ্যালয়ের উদ্বোধন করেছিলেন। এই বিদ্যালয় সচল হলে পাহাড়ের দুর্গম এলাকার শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত হবে এবং ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রীয় এই আমানতকে সচল করার উদ্যোগ শুধু এই একটি বিদ্যালয়ের অস্তিত্বই ফিরিয়ে আনবে না, বরং এটি আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে উন্নয়নমূলক ধারা অব্যাহত রাখার এক নতুন নজির স্থাপন করবে।

আমাদের জাতীয় প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের জন্য দলমত নির্বিশেষে এক সমন্বিত ও উদার রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। সরকার বদলালেও যেন রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ থাকে এবং জনগণের অর্থে নির্মিত সম্পদ যেন ব্যক্তির স্বার্থে নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে একটি টেকসই নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। দীর্ঘ দুই দশক পর রামগড় আবাসিক বিদ্যালয়ের পুনর্জাগরণ যেন কেবল একটি একক ঘটনা হয়ে না থাকে, বরং দেশের ভবিষ্যত রাজনীতিতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা ও জনকল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার এক যুগান্তকারী সূচনা হিসেবে পরিগণিত হয়।

লেখক: এম মহাসিন মিয়া

সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

ইমেইল: mmohasinmiah013@gmail.com

আপনার মতামত লিখুন

চ্যানেল সিএইচটি

সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬


দুই দশকেও বদলায়নি ভাগ্য: রামগড়ের পরিত্যক্ত আবাসিক বিদ্যালয় ও আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি।

প্রকাশের তারিখ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

পার্বত্য চট্টগ্রামের খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় উপজেলা সদর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে তৈচালা পাড়ায় পাহাড়ের চূড়ায় ১২ একর জায়গাজুড়ে এক যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে ২০০৪ সালে শুরু হয়েছিলো এক আবাসিক বিদ্যালয়ের নির্মাণকাজ। দুর্গম পাহাড়ের অনাথ, এতিম ও দরিদ্র শিশুদের বিনামূল্যে শিক্ষার আলো দিতে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে নির্মিত এই ভবন ২০০৬ সালে উদ্বোধন হলেও দুই দশক ধরে চালু হয়নি। পরবর্তীতে ১/১১ এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পরবর্তীতে আসা সরকারের দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পরও সচল হয়নি সম্ভাবনাময় এই প্রকল্প। পরিচর্যার অভাবে আজ শ্রেণিকক্ষের মরচে ধরা জানালা, খসে পড়া ইট-পাথরে তৈরি দেয়াল ও অকেজো পড়ে থাকা আবাসিক আসবাবপত্র কেবল সরকারি অর্থ অপচয়ের এক নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে রাঙামাটির রাজস্থলী এবং বান্দরবানের রুমায় সমসাময়িক প্রকল্পগুলো পরবর্তীতে সফলভাবে চালু হলেও রামগড়ের এই বিদ্যালয়টি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনীতির মারপ্যাঁচে আটকা পড়ে। অথচ ২০০৭ সালে এখানে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করা হয়েছিলো এবং ২০০৮ সালের শুরুতেই ১২০ জন অনাথ বালক-বালিকার ভর্তির আবেদনও নেওয়া সম্পন্ন হয়েছিলো। কিন্তু রহস্যজনক কারণে শেষ মুহূর্তে বিদ্যালয়টির কার্যক্রম বাতিল করা হয় এবং কর্মী ও শিক্ষার্থীদের ভর্তি স্থগিত হয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ে নির্মিত একটি জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়নের এত কাছাকাছি এসেও দীর্ঘ ২০ বছর স্থবির হয়ে থাকা অত্যন্ত মর্মান্তিক।

যেকোনো দেশ বা অঞ্চলে উন্নয়ন প্রকল্প সরকারের পরিবর্তন সাপেক্ষে থেমে যাওয়া কোনো সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচয় দেয় না। যেকোনো মেয়াদে যে সরকারই কোনো প্রকল্পের সূচনা করুক না কেন, তা মূলত জনগণের করের টাকায় নির্মিত রাষ্ট্রের সম্পদ। পরবর্তী ক্ষমতায় আসা দলগুলোর নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পূর্ববর্তী সরকারের জনহিতকর কাজগুলোকে সচল রাখা ও সংরক্ষণ করা। কিন্তু রাজনৈতিক মতভিন্নতা ও কৃতিত্ব না দেওয়ার প্রবণতার কারণে যদি এমন প্রস্তুতকৃত অবকাঠামো যুগের পর যুগ অবহেলায় ফেলে রেখে "ভূতের বাড়িতে" পরিণত করা হয়, তবে তার খেসারত দিতে হয় সাধারণ জনগণকে।

আমাদের দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা হিংসাত্মক মনোভাব ও পরস্পরকে অস্বীকার করার চর্চা অনেক ভালো উদ্যোগকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করেছে। এক সরকারের উন্নয়ন অন্য সরকার এসে উপেক্ষা করবে বা নস্যাৎ করে দিয়ে নতুন করে বিপুল খরচে প্রকল্প হাতে নেবে, এই চিন্তাধারা দেশের অর্থনীতির ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করে। অন্য দলের নেওয়া সিদ্ধান্ত হলেও যদি তা জনগণের উপকার সাধন করে, তবে তা সানন্দে গ্রহণ করাই প্রকৃত রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। রামগড়ের এই বন্ধ হয়ে থাকা আবাসিক বিদ্যালয়টি রাজনৈতিক সংকীর্ণতার এমনই এক বলির পাঠা, যা পাহাড়ের শত শত শিশুর শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হওয়ার মূল কারণ।

সম্প্রতি খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার স্থানীয় সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের নেতৃবৃন্দ সরেজমিন পরিদর্শন ও বিদ্যালয়টি পুনরায় চালুর উদ্যোগ বিশেষ করে খাগড়াছড়ির জন্য একটি বড় ইতিবাচক বার্তা বহন করে। ২০০৬ সালে তৎকালীন খাগড়াছড়ি জেলার সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালে তার হাত ধরেই এই প্রকল্পের সূচনা হয়েছিলো এবং তিনিই এই বিদ্যালয়ের উদ্বোধন করেছিলেন। এই বিদ্যালয় সচল হলে পাহাড়ের দুর্গম এলাকার শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত হবে এবং ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রীয় এই আমানতকে সচল করার উদ্যোগ শুধু এই একটি বিদ্যালয়ের অস্তিত্বই ফিরিয়ে আনবে না, বরং এটি আমাদের জাতীয় রাজনীতিতে উন্নয়নমূলক ধারা অব্যাহত রাখার এক নতুন নজির স্থাপন করবে।

আমাদের জাতীয় প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের জন্য দলমত নির্বিশেষে এক সমন্বিত ও উদার রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। সরকার বদলালেও যেন রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ থাকে এবং জনগণের অর্থে নির্মিত সম্পদ যেন ব্যক্তির স্বার্থে নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে একটি টেকসই নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। দীর্ঘ দুই দশক পর রামগড় আবাসিক বিদ্যালয়ের পুনর্জাগরণ যেন কেবল একটি একক ঘটনা হয়ে না থাকে, বরং দেশের ভবিষ্যত রাজনীতিতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা ও জনকল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার এক যুগান্তকারী সূচনা হিসেবে পরিগণিত হয়।

লেখক: এম মহাসিন মিয়া

সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

ইমেইল: mmohasinmiah013@gmail.com


চ্যানেল সিএইচটি

সম্পাদক : এইচ এ আব্দুর রউফ, উপদেষ্টা : কামাল পারভেজ
কপিরাইট © ২০২৬ চ্যানেল সিএইচটি । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত